বন্যার হুমকিতে ফসল ও উত্তরণে করণীয়

কালের কণ্ঠ জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস প্রকাশিত: ২৬ জুলাই ২০২৬, ১১:২১

দেশব্যাপী বন্যার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং দেশের অভ্যন্তরে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের কারণে উত্তর, উত্তর-পূর্ব, মধ্য-উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বহু নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরই মধ্যে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও নওগাঁর কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এবং আরো কয়েকটি নদী অববাহিকার চর ও নিচু জমি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।


উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর পানি উদ্বেগজনক অবস্থায় থাকায় হাওর, বিল ও নদীর তীরবর্তী ফসলি জমিতে পানি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আত্রাই নদীর পানি বৃদ্ধিতে নওগাঁর পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। একই সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার কিছু জেলায়ও নতুন করে প্লাবন দেখা দিতে পারে।


তিস্তা, দুধকুমার ও ধরলার পরিস্থিতি আপাতত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও উজানে নতুন করে ভারি বৃষ্টি হলে তা দ্রুত বদলে যেতে পারে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধির আশঙ্কাও রয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য এলাকার উজানে ভারি বৃষ্টি হলে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো সর্বত্র ভয়াবহ নয়, তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে প্লাবনের বিস্তৃতি বাড়তে পারে এবং কৃষিজমি, গ্রামীণ অবকাঠামো ও মাঠে থাকা ফসলের ওপর চাপ তীব্র হতে পারে।


বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো বন্যার হুমকি এমন সময়ে দেখা দিয়েছে, যখন অনেক এলাকায় আউশ ধানে শীষ বের হওয়া, ফুল আসা বা দানা ভরার পর্যায়ে রয়েছে। এসব পর্যায়ে ধানগাছ কয়েক দিন পানির নিচে থাকলে সালোকসংশ্লেষণ ব্যাহত হয়, পরাগায়ণ ও দানা গঠন কমে যায় এবং গাছ হেলে পড়তে পারে। প্রবল স্রোত থাকলে ধানগাছ উপড়ে যাওয়া বা কাদা-পলির নিচে চাপা পড়ার আশঙ্কাও থাকে। পানি দ্রুত নেমে গেলেও অপুষ্ট দানা, চিটা বৃদ্ধি এবং ফলন কমে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। যেসব জমির আউশ ধান প্রায় পরিপক্ব, সেখানে সুযোগ থাকলে দ্রুত কাটার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

তবে অপরিপক্ব ধান তাড়াহুড়া করে কাটলে ফলন ও চালের গুণমান উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই জমির অবস্থা, ধানের পরিপক্বতা এবং সম্ভাব্য প্লাবনের সময় বিবেচনা করে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।


একই সময়ে রোপা আমন মৌসুমের প্রধান কার্যক্রম চলছে। বেশির ভাগ এলাকায় বীজতলা তৈরি শেষ হয়েছে। কোথাও চারা তোলা হচ্ছে, আবার কোথাও সদ্য চারা রোপণ করা হয়েছে। বীজতলা দীর্ঘ সময় ডুবে থাকলে চারা পচে যেতে বা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। সদ্য রোপণ করা চারা স্রোতে ভেসে যেতে কিংবা কাদা ও পলির নিচে চাপা পড়তে পারে। এতে কৃষককে পুনরায় জমি তৈরি, চারা সংগ্রহ ও রোপণ করতে হবে। পর্যাপ্ত চারা না পাওয়া গেলে রোপণ বিলম্বিত হবে এবং তাতে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় আমনের লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক আবাদও ব্যাহত হতে পারে।


এই ঝুঁকি মোকাবেলায় উঁচু ও নিরাপদ স্থানে বিকল্প বীজতলা তৈরি করা প্রয়োজন। বিলম্বিত রোপণের উপযোগী আলোকসংবেদী জাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। কমিউনিটি বা সমবায় ভিত্তিক বীজতলা স্থাপন করলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের মধ্যে দ্রুত চারা বিতরণ সম্ভব হবে। অতিরিক্ত চারা সংরক্ষণ, প্রয়োজনে ভাসমান বীজতলা তৈরি এবং দেরিতে রোপণযোগ্য আমন জাতের বীজ প্রস্তুত রাখাও জরুরি।


বন্যা বা জলাবদ্ধতার কারণে মূল জমিতে রোপণ বিলম্বিত হলে বোলান বা দ্বিরোপণ পদ্ধতি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। এই পদ্ধতিতে প্রথমে বীজতলার চারা তুলে উঁচু ও নিরাপদ স্থানে ঘন করে সাময়িকভাবে রোপণ করা হয়। পরে পানি নামার পর মূল জমি প্রস্তুত হলে সেই চারা আবার তুলে চূড়ান্ত জমিতে রোপণ করা হয়। এতে চারা অতিবয়স্ক হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে এবং বিলম্বিত পরিস্থিতিতেও আমন আবাদ ধরে রাখা সম্ভব হয়। তবে জাত নির্বাচন, চারার বয়স এবং প্রথম ও দ্বিতীয় রোপণের সময় ঠিক রাখার জন্য স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।


পানি নেমে যাওয়ার পর জমির প্রকৃতি ও চারার প্রাপ্যতা অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বীজতলা নষ্ট হয়ে গেলে নতুন করে বীজ বোনা এবং সুস্থ চারা থাকলে বিলম্ব না করে রোপণ করা দরকার। যেখানে চারা আংশিক নষ্ট হয়েছে, সেখানে পুরো জমি পুনরায় রোপণ না করে সুস্থ গুচ্ছ থেকে চারা ভাগ করে ফাঁকা স্থানে বসানো যেতে পারে। এতে চারা ও শ্রম—দুই-ই সাশ্রয় হবে।


জলি বা গভীর পানির আমন ধান স্বাভাবিকভাবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা পানির সঙ্গে কিছুটা খাপ খাইয়ে নিতে পারে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে পানির গভীরতা দ্রুত বেড়ে গেলে কচি গাছ সম্পূর্ণ ডুবে যেতে বা স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার পানি দ্রুত নেমে গেলে লম্বা ও দুর্বল গাছ মাটিতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে গভীর পানির ধানের ক্ষেত্রেও পানির গভীরতা, বৃদ্ধির গতি, স্রোত ও স্থায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যৎ বন্যা অভিযোজনের জন্য স্থানীয়ভাবে উপযোগী গভীর পানির ধানের জাত সংরক্ষণ, মূল্যায়ন ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও