ফোনালাপের গুঞ্জন ও স্পিকারের ফেরা: কেন রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের তোড়জোড়?
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে হঠাৎ করেই শোরগোল। বলা হচ্ছে, শুক্র বা শনিবারের মধ্যেই তিনি পদত্যাগ করবেন। যেহেতু রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগপত্র জমা দিতে হয় স্পিকারের কাছে, তাই থাইল্যান্ড সফর সংক্ষিপ্ত করে শুক্রবার দুপুরে দেশে ফিরছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ—এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
সংবিধানের ৫০ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: ‘স্পিকারের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে রাষ্ট্রপতি স্বীয় পদ ত্যাগ করতে পারবেন।’ আর ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত কিংবা রাষ্ট্রপতি পুনরায় স্বীয় কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। তার মানে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করবেন এটি নিশ্চিত এবং তার পদত্যাগের পরে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য স্পিকার সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরছেন?
প্রশ্ন হলো, হঠাৎ কেন এই তোড়জোড়? বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যে রাষ্ট্রপতির অপসারণের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছিল বিএনপি, সেই দলটি ক্ষমতায় আসার পাঁচ মাসের মাথায় কেন রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জন উঠল; হঠাৎ করে কী এমন ঘটনা ঘটল? তাছাড়া আওয়ামী লীগের আমলে নির্বাচিত যে রাষ্ট্রপতি নিজেও একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন, যিনি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে অভ্যস্ত—তিনি বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে বিএনপির ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিয়েছেন; সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে সরকারের পক্ষে লিখে দেওয়া ভাষণে অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের তীব্র সমালোচনা করেছেন—তাকেই কেন সরে যেতে হচ্ছে? তারই পদত্যাগ নিয়ে হঠাৎ কেন এত তাড়াহুড়া?
অবশ্য, সংসদে রাষ্ট্রপতি যে ভাষণ দেন, সেটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হতে হয়। যে ভাষণে সরকারের গুণকীর্তন এবং মন্ত্রণালয়গুলোর ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সারসংক্ষেপ থাকে। রাষ্ট্রপতি মূলত এটি দেখে দেখে পাঠ করেন মাত্র। ফলে তার ওই ভাষণটি আদৌ তার নিজের কি না, সেটি অন্য তর্ক। কিন্তু তারপরও যেহেতু এটি রাষ্ট্রপতির ভাষণ বলেই গৃহীত এবং স্বীকৃত, ফলে সেই ভাষণে রাষ্ট্রপতি মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই অভ্যুত্থান এবং ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সম্পর্কে কী বললেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এটি সংসদের কার্যবিবরণিতে রাষ্ট্রপতির ভাষণ হিসেবেই উল্লিখিত থাকবে। ভবিষ্যতে এটি নানা গবেষণায় তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
বলা হচ্ছে, লন্ডনে চিকিৎসা নিতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন। যদিও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে বলেছেন, এ বিষয়ে সরকারের কাছে নিশ্চিত তথ্য নেই। একই দিন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, রাষ্ট্রপতি চাইলে সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন; এখানে সরকারের কিছু বলার নেই।
প্রসঙ্গত, জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পরই ওই সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি ওঠে। তার পদত্যাগ অথবা অপসারণের দাবিতে গণভবন ঘেরাওয়ের মতো ঘটনাও ঘটে। একাধিকবার গুঞ্জন ওঠে যে, রাষ্ট্রপতি সরে যাচ্ছেন। কিন্তু অভ্যুত্থানের পরে গঠিত বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার না থাকায় রাষ্ট্রপতি কার কাছে পদত্যাগ করবেন এবং তার পদত্যাগের পরে কোন প্রক্রিয়ায় নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করা হবে—তা নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি হয়। তাছাড়া সাংবিধানিক সংকট এড়াতে বিএনপিও তখন রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ বা অপসারণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। যদিও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গত বছরের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তিনি পদত্যাগের পরিকল্পনা করেছেন; কেননা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনি অপমানিত হয়েছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন মো. সাহাবুদ্দিন। জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগের পতনের পরে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণ, রাজনৈতিক সংকট নিরসন এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে ভূমিকা পালন করেন রাষ্ট্রপতি। এমনকি ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ও জারি হয় রাষ্ট্রপতির নামে। কিন্তু এত কিছুর পরেও বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপি তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মানতে নারাজ। নির্বাচনের পরে অনুষ্ঠিত সংসদের প্রথম বৈঠকে নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিলেও, ওই দিন সংসদেই এর বিরোধিতা করে বিরোধী দল এবং তারা রাষ্ট্রপতিকে ‘লাল কার্ড’ দেখিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে।