চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান : আমার জুলাই স্মৃতি
‘এই রাষ্ট্র তার সন্তানদের বুলেট উপহার দিচ্ছে’—আমি শুধু সত্যটি লিখেছিলাম। এটিই ছিল আমার অপরাধ। তিন ঘণ্টা ধরে আমাকে পেটানো হয়েছে। সেই পিটুনির দাগ আমি আজও বয়ে বেড়াচ্ছি। এখনো মাঝে মাঝে কোমরে- হাঁটুতে তীব্র ব্যথা হয়।
সাংবাদিকতাকে আপনি নিছক একটি চাকরি হিসেবে দেখতে পারবেন না। আপনি সাদাকে সাদা বলবেন, কালোকে কালো বলবেন, অন্যায়কে অন্যায় বলবেন এবং সাংবাদিকতা হবে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর। যখন গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়, তখন গণমাধ্যম হয় সাধারণ মানুষের ভরসার জায়গা।
আমি জার্মানভিত্তিক দ্য মিরর এশিয়ার ঢাকা ব্যুরোতে কর্মরত ছিলাম, যার কারণে আমার অফিসের ওপর সরাসরি সেন্সরশিপ আরোপ করা শেখ হাসিনা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। কারণ এটি জার্মানির বন শহর থেকে প্রকাশিত হতো। ফলে এই খবরগুলো জার্মানি থেকে ‘অ্যাজ ইট ইজ’ পাবলিশ করা যেত, যেটি অনেকেই সাহস করে ছাপতে পারেননি।
১৫ জুলাইয়ের পর, যখন বাংলাদেশের কালো পিচঢালা রাজপথ আমার দেশের সাধারণ শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক কর্মীদের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল, তখনো কিন্তু আমাদের হাতে কলম ছিল, চোখে দৃষ্টি ছিল, আমাদের ক্যামেরায় লেন্স ছিল, ব্যাটারিও ছিল। কিন্তু আমরা অনেকেই তা দেখাতে পারিনি। আমি সেটুকু দেখানোর চেষ্টা করেছি। যাঁরা করেননি, তাঁদের বিষয়টি আলোচনা করব না। কারণ এমন মানুষদের নিয়ে সময় নষ্ট করতে চাই না।
১৮ জুলাইয়ের পরে বাংলাদেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রথমে আমি অন্য গণমাধ্যমের বিশেষ ব্যবস্থার ইন্টারনেট সুবিধা ব্যবহার করে খবর পাঠানোর সুযোগ পেয়েছিলাম। পরে সেই ব্যান্ডউইথও সংকুচিত করে দিলে ছবি বা ভিডিও কিছুই পাঠানো যাচ্ছিল না। তখন আমি সরাসরি মোবাইল ফোনে এখান থেকে জার্মানিতে ৪৯ টাকা মিনিটে কল করে সংবাদ দিচ্ছিলাম এবং বন শহরের অফিসে বসে দিনরাত জার্মানিতে কর্মরত সাংবাদিক মারুফ মল্লিক তা লিখে নিচ্ছিলেন। সেই সময় হাসপাতাল থেকে ডেথ রেজিস্টার গায়েব করা হচ্ছিল, পোস্টমর্টেম ছাড়া লাশ ফেরত দেওয়া হচ্ছিল, সঠিক মৃত্যুর সংখ্যা লুকানো হচ্ছিল। এমনকি পুলিশেরও কিছু সদস্য জনরোষে প্রাণ হারিয়েছিলেন।
এই খবরগুলো যখন দ্য মিরর এশিয়ার রেফারেন্সে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশ হতে থাকে, তখন ইউরোপ-আমেরিকার বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ওই নিউজ প্রকাশ করে। শিক্ষার্থীদের গণহারে হত্যার এই সংবাদটি ছড়িয়ে পড়লে শেখ হাসিনা মেট্রো রেল পরিদর্শনে গিয়ে বলেন, ‘যারা বিদেশে তথ্য পাচার করছে, তাদের চিহ্নিত করেছি, শিগগিরই তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।’
২৫ জুলাই ২০২৪, বৃহস্পতিবার, আমি, কাদের গণি চৌধুরী (সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ওই সময়ের সদস্যসচিব), সাংবাদিক আমিরুল ইসলাম কাগজী, ডিইউজের সহসভাপতি রাশেদুল ইসলামসহ আমরা প্রতিদিন প্রেস ক্লাবের সামনে এই হত্যার প্রতিবাদে সমাবেশ করেছি, বক্তব্য দিয়েছি। রাত ১১টার দিকে আমি মগবাজারে আমার বাসায় ফিরি। আমার সাত বছর বয়সী ছোট সন্তান সাঈফ খুবই অসুস্থ, তার গলায় অপারেশন হয়েছে। বড় ছেলে সাঈম তখন ক্লাস নাইনে পড়ে। আমি আমার স্ত্রী ইতীকে বলি, আমার বন্ধু মেহের কায়সার রানার কাছে কিছু টাকা রাখা আছে—‘আমি সেফ জায়গায় চলে যাব’। ঠিক ১০ মিনিটের মধ্যে আমি ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে যাব—ওই সময়েই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান (মাননীয় প্রধানমন্ত্রী) আমাকে ফোন করেন ওই সময়ের পরিস্থিতি জানার জন্য। এর কিছুক্ষণ আগে অবশ্য বেইলি রোডে রানার বাসার ছাদে বসে বিএনপির ওই সময়কার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় ২৯ মিনিট নানা বিষয়ে কথা বলেন এবং আন্দোলন যাতে বন্ধ না হয়, সেই নির্দেশনা দেন। আমার ফোন থেকে বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সহসম্পাদক ডা. পারভেজ রেজা কাকনও আহতদের চিকিৎসাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন এবং তারেক রহমানের নির্দেশনা গ্রহণ করেন।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরি যে ১৮ জুলাই শেখ হাসিনা ছাত্রদের দাবি মেনে নেন, ছাত্ররা ক্যাম্পাস এবং হল খুলে দিতে বলে, আন্দোলন যখন প্রায় শেষ, ঠিক তখনই তারেক রহমান নির্দেশ দেন পদধারী নেতারা যাতে সামনে না পড়ে, কর্মীদের নেতৃত্বের নির্দেশ দিতে বলেন। ততক্ষণে আন্দোলন ছাত্রদের হাতছাড়া হয়ে গণ-আন্দোলন হিসেবে পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে পড়ে।
১০ জুলাই থেকে প্রতিদিনই তারেক রহমান আমাকে বলেছিলেন, দুই ঘণ্টা পর পর আমি যেন পরিস্থিতি উনাকে অবহিত করি। নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু মোবাইলের ব্যালান্স সংকটে পড়ে যাই। বন্ধু সাইফুর রহমান আসাদ সেগুনবাগিচা এলাকায় একা একা আন্দোলনের নানা দিক নিয়ে কৌশলে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন এবং ছাত্র-জনতাকে রাস্তা ছাড়তে নিষেধ করছিলেন। আসাদকে বললাম, মোবাইলে ব্যালান্স কই পাব। সে আমাকে ১৫ হাজার টাকা লোডের ব্যবস্থা করে দেয়। সেই টাকা দিয়েই লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির শীর্ষ নেতাকে অবহিত করি সার্বিক পরিস্থিতি। সেই আলাপ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ট্র্যাক করে ফেলে। এর পর থেকেই তারা আমাকে সন্দেহ করতে থাকে এই নাশকতার পরিকল্পনাকারী হিসেবে।
হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়া হয়। বাইরে থেকে বলা হয়, ‘ইন্টারনেটের ওয়াই-ফাই ঠিক করতে এসেছি।’ এই অজুহাতে দরজা খুলতেই ১৫-১৬ জন সাদা পোশাকধারী লোক ঘরে ঢুকে পড়ে। আমার অসুস্থ ছোট সন্তান ও বড় ছেলের সামনে তারা আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। এমন অশ্লীল ও জঘন্য ভাষা—কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। তারা সবাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার সদস্য—বিসিএস ক্যাডার, কমিশনড অফিসার, বিভিন্ন বাহিনীর মিশ্রণ। আমার স্ত্রীকেও তারা এমন ভাষায় গালি দেয়, যা আমরা সবচেয়ে তিক্ত পরিস্থিতিতেও কোনো নারীকে বলি না। আমার ছেলেকেও তারা তুলে নিতে চায়।
আমি অনুরোধ করি, ‘আমাকে নিয়ে যান, আমাকে যা খুশি করেন, কিন্তু আমার পরিবারকে স্পর্শ করবেন না, প্লিজ।’ পরে তারা আমাকে গাড়িতে তোলে। চোখ বেঁধে, দুই হাত পেছনে বেঁধে, হাতকড়া পরিয়ে, মাথায় একটি কালো টুপি পরিয়ে দেয়। আমি নিজেই বহুবার এই টুপির সংবাদ করেছি।
আমি বললাম, ‘আমি তো কোনো সন্ত্রাসী না, আমাকে কেন এভাবে নিচ্ছেন?’ তখন পেছন থেকে একটি শক্ত কিছু দিয়ে—সম্ভবত লাঠি বা শটগানের বাঁট—আমার ঘাড়ের পেছনে ১৫ থেকে ২০ বার আঘাত করা হয়। আমার মনে হচ্ছিল চোখ বেরিয়ে আসবে, দাঁত খসে যাবে। আমি একপ্রকার অচেতন হয়ে যাই। তারপর তারা আমার পাঁজরের পেছনে বেশ কয়েকবার বক্সিংয়ের মতো আঘাত করে। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তখনই বুঝে যাই—এদের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই, চুপ থাকাই ভালো।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জুলাই গণঅভ্যুত্থান