যাদু মিয়ার বর্ণাঢ্য জীবন ঈর্ষণীয়
আজ মঙ্গলবার। প্রতি সপ্তাহে আমার লেখা যে কলাম দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত হয়, তার পাণ্ডুলিপি মঙ্গলবারেই লেখা হয়। প্রেস ক্লাবে গিয়েছিলাম জননেতা মরহুম মশিউর রহমান যাদু মিয়ার ১০২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আলোচনা সভায় যোগ দিতে। এই স্মরণসভার আয়োজন করেছিল মশিউর রহমান যাদু মিয়ার কন্যা রিটা রহমান। বাংলাদেশোত্তর কালে অনেক বরেণ্য ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। এর আগে পাকিস্তান আমলেও এবং ব্রিটিশ আমলে আমরা অনেক জ্ঞানী-গুণী সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে হারিয়েছি। দেশ ও সমাজ গঠনে এদের ভূমিকা ছিল অনন্য। কিন্তু আমরা ক’জনের কথা মনে রেখেছি? ক’জনের জন্ম ও মৃত্যুদিবস পালন করা হয়। যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে কারোর জন্য স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়, তার বেশির ভাগই হয় তাদের পরিবারের সদস্যদের উদ্যোগে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এদের স্মরণ করার এবং এদের অবদানকে জনগণের কাছে তুলে ধরার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। সে ধরনের কিছু আয়োজন করা যায় জাতীয় জাদুঘর কিংবা জাতীয় আর্কাইভের ব্যবস্থাপনায়। বর্তমানে প্রযুক্তির ঘাটতি নেই। এসব মহান ব্যক্তির জীবন ও কর্মের ওপর প্রামাণ্য ডকুমেন্টারি তৈরি করে এদের স্মৃতি রক্ষা করা যায়। নতুন প্রজন্ম যদি না জানে তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কারা মানবজাতির হীতকল্পে অবদান রেখেছেন, তাহলে তারা কীভাবে মহৎ কিছু অর্জনের জন্য অনুপ্রাণিত হবে। আশা করি বর্তমান সরকার এ ঘাটতি পূরণের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কোনো কোনো দৈনিক পত্রিকা অবশ্য পরলোকগত স্মরণীয়-বরণীয় ব্যক্তিদের নিয়ে তাদের জীবন পরিচিতি প্রকাশ করে। এ উদ্যোগ প্রশংসনীয় এবং আরও ব্যাপকভাবে ও সুষ্ঠুভাবে প্রতিপালিত হলে জাতির কৃতজ্ঞতা সার্থকভাবে প্রকাশ পাবে।
এবার মশিউর রহমান যাদু মিয়ার প্রসঙ্গে আসি। ১৯২৪ সালের ৯ জুলাই রংপুর জেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ওসমান গণি ও মাতা আলহাজ আবিয়ন নেছা তৎকালে সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তি ছিলেন। তার মাতা আবিয়ন নেছা একজন প্রাগ্রসর নারী ছিলেন। তিনি অল বেঙ্গল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন। এটা কম কথা নয়।
ছাত্রজীবন থেকে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। ছাত্র থাকাকালীন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তিনি নেতাজি সুভাস চন্দ্রের আহ্বানে বার্মা যান এবং সেখানে আইএনএ’র সঙ্গে সহযোগিতা করেন। ১৯৪৩-এ দুর্ভিক্ষের সময় রংপুরের চরাঞ্চলে প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। তিনি মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে জনসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। মশিউর রহমান যাদু মিয়ার জনসেবার এ দৃষ্টান্তকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ভুরুঙ্গামারিসংলগ্ন একটি চরের নাম রাখা হয় ‘যাদুর চর’।
যাদু মিয়া ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। তিনি ১৯৪৬-এর ভয়াবহ হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গার সময় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে দাঙ্গার মর্মান্তিক ছবি ও মানবিক দিকগুলো তুলে ধরে যাদু মিয়ার ওপর একটি বিশেষ বুলেটিন প্রকাশ করেন। বুলেটিনে প্রকাশিত লাশের ছবি উত্তেজনায় উসকানি দিচ্ছে অভিযোগ এনে ব্রিটিশ সরকার তাকে গ্রেফতার করে। দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিচার সভায় যাদু মিয়া নিজেই আত্মপক্ষ সমর্থন করেন। তার ক্ষুরধার যুক্তির মুখে তাকে সসম্মানে মুক্তি দেওয়া হয়। এবং একটি স্পেশাল স্কোয়াড তাকে তার নিজ বাড়ি নীলফামারীর খগা খড়িবাড়িতে পৌঁছে দেয়।
যাদু মিয়া ছিলেন ইয়াং ম্যান অ্যাসোসিয়েশন অব পাকিস্তানের ইস্ট পাকিস্তান শাখার প্রধান, রংপুর ডিস্ট্রিক্ট স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের অনারারি সেক্রেটারি এবং তিনি ১৯৫৪-৫৮ পর্বে রংপুর ডিস্ট্রিক্ট কনজুমার্স কোঅপারেটিভ সোসাইটির নির্বাচিত অনারারি সেক্রেটারি এবং পরবর্তী সময়ে এর নির্বাচিত সভাপতি। ৫০-এর দশকের প্রথমার্ধে তিনি রংপুর জেলা বোর্ডের নির্বাচিত কনিষ্ঠতম চেয়ারম্যান ছিলেন এবং তিনি এই পদে ২ মেয়াদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির ফ্রন্ট সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান যুব উৎসবের প্রস্তুতি কমিটির চেয়ারম্যান হন। সেই সময় যুব উৎসবটি যাতে না হতে পারে, সেজন্য অনেক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। তারই বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ফলে যুব উৎসবটি সফল হয়।
১৯৫৭ সালে তিনি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন এবং একই বছর ঐতিহাসিক কাগমারি সম্মেলন সফল করার জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬২ সালে তিনি পাকিস্তান ন্যাশনাল এসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিরোধী দল গঠন করেন এবং এর উপনেতা হিসাবে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। পাকিস্তান ন্যাশনাল এসেম্বলিতে তিনি শোষিত-বঞ্চিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থে বুলন্দ আওয়াজ তুলেছিলেন। তার এ ভূমিকা ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টিতে বিরাট ভূমিকা রাখে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জন্মবার্ষিকী
- স্মরণসভা