বাংলাদেশের জন্য মেধাতন্ত্র কেন অপরিহার্য
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট কি মেধাবী মানুষের অভাব? সম্ভবত নয়। বরং বড় সংকট হলো, মেধাবী মানুষকে খুঁজে বের করা, তাকে যথাযথ জায়গায় বসানো এবং তার মেধাকে রাষ্ট্রের কাজে ব্যবহারের একটি বিশ্বাসযোগ্য ও স্থায়ী ব্যবস্থা আমাদের কতটা আছে। একটি রাষ্ট্র এগোয়, যখন সে শুধু সম্পদ, অবকাঠামো বা অর্থনীতির আকার বাড়ায় না বরং তার সবচেয়ে যোগ্য মানুষগুলোকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়ে আসে। এ জায়গাতেই মেধাতন্ত্রের প্রশ্নটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সততা, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান-সব মিলেই মেধা। কাজেই মেধাতন্ত্রের সহজ অর্থ হতে পারে : সঠিক কাজের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মানুষকে বেছে নেওয়া।
আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে অনেক সময় প্রশ্নটি হয় না, ‘কে সবচেয়ে যোগ্য?’ প্রশ্নটি হয়ে যায়, ‘তিনি কার লোক?’ কার সঙ্গে তার সম্পর্ক, কোন রাজনৈতিক পরিচয় আছে, কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তিকে তিনি চেনেন, কে তার জন্য তদবির করতে পারেন, তিনি কোনো অঞ্চলের, কতটা অনুগত, এসব বিষয় কখনো কখনো যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যখন একটি রাষ্ট্রে ‘কার লোক’ হওয়ার গুরুত্ব ‘কাজের লোক’ হওয়ার গুরুত্বকে ছাড়িয়ে যায়, তখন ক্ষতিটা শুধু একজন যোগ্য ব্যক্তির হয় না, ক্ষতিটা পুরো দেশের হয়।
কারণ মেধাতন্ত্রের অনুপস্থিতির মূল্য অনেক বড়। অযোগ্য একজন মানুষকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসানোর অর্থ শুধু একটি খারাপ নিয়োগ নয়। এর অর্থ হতে পারে ভুল নীতি, ভুল সিদ্ধান্ত, বিনিয়োগ হারানো, দুর্বল দরকষাকষি, প্রশাসনিক স্থবিরতা, দুর্নীতি, মানুষের আস্থা নষ্ট হওয়া এবং কখনো কখনো বহু বছরের জাতীয় ক্ষতি।
কূটনীতির কথাই ধরা যাক। আজকের বিশ্বে কূটনীতি শুধু রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, বৈঠক বা সৌজন্য বিনিময়ের বিষয় নয়। একজন দক্ষ কূটনীতিককে একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বুঝতে হয়, অর্থনীতি বুঝতে হয়, বাণিজ্য বুঝতে হয়, ভাষা ও যোগাযোগ জানতে হয়, দরকষাকষিতে দক্ষ হতে হয় এবং নিজের দেশের স্বার্থ কোথায়-তা খুব সূক্ষ্মভাবে বুঝতে হয়। পানি বণ্টন, সীমান্ত, বাণিজ্যচুক্তি, অভিবাসন, জলবায়ু অর্থায়ন, রোহিঙ্গা সংকট, সামুদ্রিক স্বার্থ কিংবা বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক-এসব ক্ষেত্রে একটি ভুল বাক্য, দুর্বল প্রস্তুতি বা অদক্ষ দর-কষাকষির মূল্য কখনো কখনো কোটি নয়, বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। সুতরাং কূটনীতিতে মেধাতন্ত্র কোনো সৌন্দর্যবর্ধক ধারণা নয়। এটি সরাসরি জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন। যে দেশ সবচেয়ে ভালো আলোচককে আলোচনার টেবিলে পাঠায়, যে দেশ সবচেয়ে ভালো মস্তিষ্ককে নীতি তৈরির দায়িত্ব দেয়, প্রতিযোগিতায় তার এগিয়ে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
অর্থনীতি ও ব্যবসার ক্ষেত্রেও একই কথা। বাংলাদেশ এখন আর শুধু পোশাক রপ্তানির অর্থনীতি নয়। সামনে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল, মুক্তবাণিজ্য চুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি, আর্থিক বাজার এবং বিদেশি বিনিয়োগের জটিল জগৎ। এই অর্থনীতি পরিচালনা করতে হলে সবচেয়ে দক্ষ অর্থনীতিবিদ, প্রযুক্তিবিদ, ব্যবসা-বিশেষজ্ঞ, আর্থিক বিশ্লেষক এবং আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে পারদর্শী মানুষদের নীতি তৈরির জায়গায় আনতে হবে।
একটি বড় বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে কারখানা করবে নাকি ভিয়েতনাম, ভারত বা ইন্দোনেশিয়ায় যাবে, এটি শুধু করের হারের ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে সরকার কতটা দক্ষ, নীতির ধারাবাহিকতা কতটা আছে, আলোচনায় কারা বসছেন, কী ধরনের প্রণোদনা তৈরি করা হচ্ছে এবং ব্যবসার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে রাষ্ট্র কতটা পরিষ্কার। অযোগ্যতা এখানে সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতি তৈরি করতে পারে।
শিক্ষাব্যবস্থায় মেধার প্রশ্ন আরও গভীর। যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতার বদলে পরিচয় বড় হয়, যদি উপাচার্য নির্বাচন দক্ষতা ও একাডেমিক নেতৃত্বের বদলে আনুগত্যের ওপর নির্ভর করে, যদি গবেষণার অর্থ বণ্টনে প্রকৃত মানের চেয়ে সম্পর্ক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে জ্ঞান তৈরির প্রতিষ্ঠান না থেকে চাকরি ও পদবণ্টনের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
একজন সত্যিকার যোগ্য শিক্ষামন্ত্রী, বিশ্ববিদ্যালয় নেতা বা নীতিনির্ধারক শুধু নিজের কাজ ভালো করেন না, তিনি একটি পুরো ব্যবস্থাকে বদলে দিতে পারেন। একজন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য শিক্ষানেতা বিশ্বের বড় বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক, সম্মেলন, অনুদান ও সহযোগিতা দেশে আনতে পারেন। একজন দক্ষ বাণিজ্যমন্ত্রী নতুন বাজার খুলতে পারেন। একজন শক্তিশালী পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের অবস্থান বদলে দিতে পারেন। একজন ভালো কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর আর্থিক শৃঙ্খলারক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। অর্থাৎ মেধার একটি বহুগুণ প্রভাব আছে।
এর বিপরীতও সত্য। একজন অযোগ্য মানুষ গুরুত্বপূর্ণ পদে বসলে তার অযোগ্যতার প্রভাব তার ডেস্কে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেটি নিচে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি আবার নিজের চারপাশে যোগ্য মানুষের বদলে অনুগত মানুষ চান। একটি ভুল নিয়োগ থেকে আরও দশটি ভুল নিয়োগ তৈরি হতে পারে। এভাবেই প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সংকট
- মেধাবী শিক্ষার্থী