গালাগালিই আছে, গলাগলি নেই
অস্বস্তিটা আসলে সন্তান বা সন্তানদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে। ওরা যদি এখন জানতে চায়, বহুল ব্যবহৃত এমন কোনো শব্দের অর্থ, তাহলে অভিভাবকেরা বিপদে পড়ে যেতে পারেন। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে বিএনপি নেতা ফজলুর রহমানের বাড়ির সামনে বসে এক তরুণী যেভাবে ‘শ’ দিয়ে শুরু—এ রকম জননেন্দ্রিয়কেন্দ্রিক একটি গাল দিচ্ছিল হাসিমুখে, তখনই বোঝা গিয়েছিল, ‘ভেতরে ভেতরে ফাঁক রয়ে গেছে।’ অর্থাৎ বাইরে যতই স্মার্টনেস আনার চেষ্টা থাকুক না কেন, ভেতরটা ফাঁপা। এই ফাঁপা বাস্তবতার প্রমাণ মিলবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দিকে খেয়াল রাখলেই। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইত্যাদির চেয়ে কোনো অংশে কম নয় এই দুর্যোগ। ভাষাতত্ত্বে আগ্রহ আছে, এমন মানুষেরা এই প্রবণতা নিয়ে গবেষণা করতে পারেন। এবং নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ‘পাইলেও পাইতে পার’ না বলে বলতে হবে, পাবেই পাবে ‘অমূল্য রতন।’
যাঁরা খুব হতাশ হচ্ছেন, তাঁদের আশ্বস্ত করে বলি, চাইলেই ভাষার গতি অধোমুখে যাত্রা করবে, এমনটা ভাবার প্রয়োজন নেই। ইতিহাসের দিকে একটু নজর দেব আমরা। বোঝার চেষ্টা করব, কেন এ রকম উল্টাপাল্টা শব্দ এসে শব্দভান্ডারকে বিচলিত করে। বোঝার চেষ্টা করব, কোন পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে কোন কোন শব্দ হঠাৎ করে সক্রিয় হয়ে ওঠে, বোঝার চেষ্টা করব, এই পাগলামিটার শেষ কোথায়।
গালাগাল হলেই তা ভাষার অবক্ষয় হয়েছে, এ রকম কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না ভাষাতত্ত্ব। ভাষাকাঠামো এত ঠুনকো নয় যে অশ্লীল শব্দ জনপ্রিয় হয়ে উঠলেই ‘গেল গেল’ রব ওঠাতে হবে। ভাষাতত্ত্বের শিক্ষার্থীমাত্রই জানেন, একটি ভাষায় নতুন শব্দ আসা বা পুরোনো অপ্রচলিত শব্দ হঠাৎ করে বেশি বেশি উচ্চারিত হওয়ার পেছনে সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটা বড় ভূমিকা থাকে। গণ-আন্দোলন বা নতুন সামাজিক বাস্তবতা এমন সব ঘটনার জন্ম দেয়, যা সজোরে আঘাত করে পুরোনো মূল্যবোধে। এটা বহু পুরোনো কথা। যুগে যুগে এই স্রোত এসে আছড়ে পড়েছে ভাষাসমুদ্রে।
২. গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাজনৈতিক ক্ষমতা কার হাতে আছে, তা দিয়ে এই বাস্তবতাকে দেখতে হয়। যখন ক্ষমতাশালীরা এই প্রবণতা বাড়তে দেন, তখন বিভিন্ন মহল এসব শব্দ ব্যবহারের লাইসেন্স পেয়ে যায়। একটি ‘ক্লিক’ করে গেলে চলে আসে পরবর্তী শব্দ। এই শব্দ বিপুলভাবে ছড়িয়ে দেয় ক্ষমতাবান রাজনৈতিক গোষ্ঠী। গণমাধ্যম অথবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রচার করে তা জনগণের নজরে নিয়ে আসে। তখনই তা ব্যাপক হারে ব্যবহার হতে থাকে। আগের যুগের সঙ্গে বর্তমান যুগের একটা বড় পার্থক্য হলো, সে সময় একটি নেটের দুনিয়া ছিল না। মানুষ মাথা নিচু করে একটি স্মার্টফোনের ভেতরেই পৃথিবীর সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজত না। তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমস্যার রূপও পাল্টেছে। কিন্তু সমস্যাটা হঠাৎ করে গজিয়ে উঠেছে—এ রকম ভাবার কোনো কারণ নেই।
একটি শব্দ টেলিভিশন, ফেসবুক, ইউটিউব ইত্যাদি মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক বক্তৃতায়ও তা ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সময়ে ব্যাপক ব্যবহার হলেই তা স্বীকৃতি পেয়ে যাবে, এমন ভাবা ঠিক নয়। স্বীকৃতির জন্য বেশ কিছু বিষয়ের দিকে নজর রাখতে হয়। দেখতে হয়, কত মানুষ শব্দটি ব্যবহার করছে, কত দীর্ঘ সময় ধরে তা ব্যবহৃত হচ্ছে, কোন সামাজিক গোষ্ঠী তা ব্যবহার করছে, লিখিত ভাষায় তা ঢুকে পড়েছে কি না, সংবাদমাধ্যম শব্দটিকে ব্যবহার করছে কি না, শিক্ষিত বক্তাদের ঠোঁটেও সে শব্দ কি দেখা যাচ্ছে?
যদি এই বিষয়গুলোর উত্তর ইতিবাচক হয়, তাহলে শব্দটি শক্তিশালী হয়েই টিকে থাকবে ভাষায়। নইলে ধীরে ধীরে তা হারিয়ে যাবে। ইতিহাসের গল্প বলার সময় শুধু বলা হবে, ও রকম রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে এই ধরনের কিছু শব্দ উঠে এসেছিল মানুষের জিহ্বায়।
৩. একটু দূর থেকে আলোচনাটা শুরু করা যাক। শব্দ টিকে যাওয়া-না যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে কথা বলার আগে গুরুগম্ভীর আলোচনাটাকে সহজ করা দরকার। ভাষায় যে শব্দগুলো ছিল কিংবা নতুন করে ঢুকল, সেগুলো কীভাবে টিকবে কিংবা তার অর্থ পরিবর্তন হবে কি না, তা নির্ভর করে রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিবর্তনের ওপর। সবচেয়ে সহজ একটি উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে।