ফুটবলপ্রেমী জাতি, ফুটবলে এত পিছিয়ে কেন?
বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও বাংলাদেশের শহর, বন্দর, গ্রাম ও মফস্বলজুড়ে ছিল ফুটবলের উন্মাদনা। কোথাও আর্জেন্টিনার পতাকা, কোথাও ব্রাজিলের জার্সি, কোথাও রাতভর বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন। কোনো কোনো এলাকায় প্রিয় দলের জয়কে কেন্দ্র করে মিছিল হয়েছে, বাজি ফুটেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। মনে হয়েছে, ফুটবল যেন বাংলাদেশের মানুষের রক্তে মিশে আছে।
কিন্তু বিশ্বকাপের উন্মাদনা শেষ হওয়ার পর যখন মাঠ ফাঁকা হয়, পতাকা নামানো হয়, জার্সি আলমারিতে উঠে যায়—তখন একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা সামনে এসে দাঁড়ায়। যে দেশের মানুষ ফুটবলকে এত ভালোবাসে, সেই দেশের ফুটবল কোথায়?
বাংলাদেশ বিশ্বকাপের মূল পর্বে কখনো খেলতে পারেনি। বিশ্ব ফুটবলে বাংলাদেশের অবস্থানও দীর্ঘদিন ধরে নিম্নসারিতে। সর্বশেষ ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০’র ঘরে। এশিয়ার ফুটবল মানচিত্রেও আমরা শক্তিশালী দেশগুলোর ধারেকাছে নেই। অথচ ফুটবলপ্রেমী মানুষের সংখ্যায় বাংলাদেশ বিশ্বের কোনো দেশের চেয়ে কম নয়।
এই বৈপরীত্য কেবল দুঃখজনক নয়; এটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি।
কারণ, বাংলাদেশের ফুটবলের সমস্যা প্রতিভার অভাব নয়। সমস্যা হলো—প্রতিভা তৈরি, খুঁজে বের করা এবং ধরে রাখার জন্য আমরা কার্যকর কোনো জাতীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি।
একটি শিশু ফুটবল খেলছে—এটি প্রতিভার প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। কিন্তু সেই শিশুকে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড়ে পরিণত করতে হলে প্রয়োজন মাঠ, প্রশিক্ষক, প্রতিযোগিতা, পুষ্টি, চিকিৎসা, ক্রীড়া বিজ্ঞান, মানসিক প্রস্তুতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা। বাংলাদেশের ফুটবল ব্যবস্থায় এই ধারাবাহিকতার অধিকাংশই অনুপস্থিত।
আমরা ফল চাই, কিন্তু বীজ বপন করতে চাই না।
বিশ্বের ফুটবল শক্তিগুলো একদিনে শক্তিশালী হয়নি। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স—কেউই শুধু প্রতিভার ওপর নির্ভর করে বিশ্ব ফুটবলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেনি। তাদের পেছনে আছে ক্লাব, একাডেমি, স্কুল ফুটবল, বয়সভিত্তিক লিগ, প্রশিক্ষিত কোচ, স্কাউটিং ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
এশিয়ায় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। কয়েক দশক আগেও তারা বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ সারির দেশ ছিল না। কিন্তু তারা বুঝেছিল, জাতীয় দলকে ভালো খেলানোর জন্য শুধু ভালো কোচ নিয়োগ করলেই হবে না; খেলোয়াড় তৈরির পুরো কাঠামো বদলাতে হবে। পেশাদার লিগ, বয়সভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ক্লাব একাডেমি ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থান বদলেছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- উদ্যোগ
- বিশ্বকাপের উন্মাদনা
- ফুটবল খেলা