পাঁচ মাসের যুদ্ধ ও হরমুজ বন্ধ থাকার পরও তেলের দাম কেন আকাশ ছুঁচ্ছে না
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়াল যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তখন বিশ্লেষকেরা পূর্বাভাস দিয়েছিলেন—অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার, এমনকি ২০০ ডলার পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে। কারণ, বিশ্বে সরবরাহ হওয়া মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, তা হঠাৎ করে বিশ্ববাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম সর্বোচ্চ প্রায় ১২৬ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল, যা ২০০৮ সালের সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৪৭ ডলারের চেয়ে অনেক কম। আর ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়া থেকে ১১ জুন পর্যন্ত, যেদিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর হামলা বন্ধের ঘোষণা দেন, সেই সময়ে ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১০১ ডলার। এরপর জুলাইয়ের শুরুতে দাম সাময়িকভাবে যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ে নেমে প্রায় ৭০ ডলারে পৌঁছে যায়।
নিচে তুলে ধরা হলো কেন তেলের দাম প্রত্যাশামতো অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়নি। অন্তত এখন পর্যন্ত।
১. চীনের অপ্রত্যাশিত ভূমিকা
সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশ চীন। জুন নাগাদ দেশটি প্রায় এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে অপরিশোধিত তেল আমদানি কমিয়ে আনে। চীন জ্বালানি রপ্তানি কমিয়ে দেয়, জনগণ ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে বৈদ্যুতিক ট্যাক্সি ব্যবহার শুরু করে এবং দেশটির পেট্রোকেমিক্যাল খাতও তেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে।
২. যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন বৃদ্ধি
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র অপরিশোধিত তেল উৎপাদন আরও বাড়ায়। এপ্রিল নাগাদ দেশটির উৎপাদন দৈনিক রেকর্ড ১ কোটি ৩৯ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছে যায়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-এর সমন্বয়ে মার্চ মাসে রেকর্ড ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তার স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) থেকে তেল সরবরাহ করে, যা সরবরাহ বিঘ্নের প্রভাব অনেকটা সামাল দিতে সাহায্য করে।
৩. ট্রাম্পের বার্তায় এলোমেলো বাজারের হিসাব
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার শান্তি চুক্তি এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবারও তেল পরিবহন শুরু হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলে তেলের দাম আরও বাড়বে বলে বাজি ধরা বিনিয়োগকারীদের হিসাব এলোমেলো করে দেন। হঠাৎ বাজার ঘুরে যাওয়ার ঝুঁকির কারণে অনেক ব্যবসায়ী বড় ধরনের ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েন, ফলে তেলবাজারের লেনদেনের তারল্যও কমে যায়।