জুলাই বিপ্লবের শত্রু-মিত্র
২০২৪ সালের জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক অতি সংকুল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলছে, যেখানে ভিড় করেছে জুলাই বিপ্লবের শত্রু-মিত্র, উভয় পক্ষই। ফলে উদ্দেশ্যমূলকভাবে জুলাইকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তি ও ধোঁয়াশা তৈরি করার পটভূমিতে অনুসন্ধান করতে হচ্ছে জুলাইয়ের চেতনায় রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পথে কারা সহযাত্রী, কারা প্রতিবন্ধক?
উত্তরটি খুঁজে বের করার আগে বিপ্লবের ইতিহাসে একটি পুরোনো সত্য জানতে হবে। সত্যটি হলো-বিপ্লবের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বিপ্লবের সময় নয়, বিপ্লবের পর হয়। বিপ্লব বা আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতন তুলনামূলক সহজ; কিন্তু বিপ্লবের ভাবাদর্শে রাষ্ট্রের চরিত্র বদলানো অত্যন্ত কঠিন। কারণ একটি শাসকগোষ্ঠী পরাজিত হলেও তার গড়ে তোলা রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক মানসিকতা, অর্থনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠী এবং ক্ষমতার নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন টিকে থাকে। তারা চেহারা ও চরিত্র বদলে বিপ্লবীর ভেক ধরে এবং সময় ও সুযোগ পেলে চরম অন্তর্ঘাত করতে থাকে। জুলাই বিপ্লবের দুই বছরের মাথায় বাংলাদেশে চলছে এ প্রতিবিপ্লবী গোষ্ঠীর শাঠ্য-ষড়যন্ত্রের খেলা। যে কারণে শুধু জুলাই বিপ্লবের মতাদর্শকে ব্যাহত করাই নয়, বিপ্লব ও আন্দোলনকে নোংরা ভাষায় আক্রমণ করার ঘটনাও সামনে দেখা যাচ্ছে।
ফলে বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান একটি আক্রান্ত পরিস্থিতির মুখোমুখি। অথচ বাস্তবতা হলো, জুলাই কেবল একটি রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না। নিছক ক্ষমতার মসনদ বদলের লড়াই ছিল না। ছিল রাষ্ট্রকে আরও জবাবদিহিমূলক, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক করার আকাঙ্ক্ষা আর একদলীয় ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির নোংরা অতীতকে মুছে ফেলার প্রত্যাশা। কিন্তু এ আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথে আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-জুলাইয়ের প্রকৃত মিত্র কারা? আর শত্রুই বা কারা? রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পথে কারা সহযাত্রী, কারা প্রতিবন্ধক?
এ প্রশ্নের উত্তর কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে কেন্দ্র করে খোঁজা উচিত নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তি নয়; কাঠামো, সংস্কৃতি এবং স্বার্থের জোট। তাই জুলাইয়ের শত্রু-মিত্রও ব্যক্তি নয়। বরং ধারণা, প্রতিষ্ঠান, আচরণ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি। যদিও নানা ব্যক্তি ও গোষ্ঠী জুলাইয়ের শত্রুতা করছে নানা স্বার্থের কারণে। তারা আসলে গণতান্ত্রিক রূপান্তরবিরোধী কাঠামো, সংস্কৃতি এবং স্বার্থের জোটের অংশ।
যদি আমরা জুলাইয়ের মিত্র ও শত্রুদের তালিকা করি, তাহলে স্পষ্টভাবে বিষয়গুলো উন্মোচিত হবে। প্রথমেই মিত্রের তালিকা দেখা যেতে পারে। জুলাইয়ের প্রথম ও সবচেয়ে বড় মিত্র হলো গণতান্ত্রিকতার চেতনা ও মতাদর্শ। এখানে গণতন্ত্র বলতে শুধু নির্বাচন বোঝানো হচ্ছে না। বোঝানো হচ্ছে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে আইনের শাসন থাকবে, ভিন্নমতের নিরাপত্তা থাকবে, ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন সম্ভব হবে এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় আনুগত্য নয়, সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকবে।
জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় মিত্র দলীয় তাঁবেদারদের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজের স্বাধীন চিন্তা। প্রতিটি গণ-অভ্যুত্থানের নৈতিক শক্তি আসে নাগরিক সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী এবং সচেতন নাগরিকদের কাছ থেকে। কিন্তু যখন স্বাধীন চিন্তার জায়গা সংকুচিত হয় এবং দলীয় চাটুকাররা একতরফা ও অগ্রহণযোগ্য বয়ান তৈরি করে, তখন কর্তৃত্ববাদ শক্তিশালী হয় আর ভিন্নমত পদদলিত হয়। জুলাইয়ের প্রকৃত চেতনা দলীয় আনুগত্যের নয়, নাগরিক অংশগ্রহণের স্বাধীন পরিবেশের মধ্যে নিহিত।
জুলাইয়ের তৃতীয় ও শক্তিশালী মিত্র তরুণ প্রজন্ম তথা ছাত্র-যুবশক্তি। ২০২৪ সালের জুলাই দেখিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশের তরুণরা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় নয়, তারা প্রয়োজনে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও অবস্থান নিতে পারে। এমন একটি প্রাণবন্ত তরুণদের ভূমিকা যদি কেবল আন্দোলনে সীমাবদ্ধ থাকে এবং নীতিনির্ধারণ, স্থানীয় সরকার, রাজনৈতিক দল, সংসদ কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের প্রবেশাধিকার না বাড়ে, তাহলে জুলাইয়ের শক্তি ধীরে ধীরে ক্ষয় হবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জুলাই বিপ্লব