পলাশী থেকে জুলাই : ইতিহাসের কড়া বার্তা
১৬০০ সাল থেকে ১৮০০ সালের মধ্যবর্তী সময়টি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক রচিত বাংলার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের এক মর্মান্তিক ইতিহাস। পলাশীর যুদ্ধ (২৩, জুন ১৭৫৭) কেবল একটি সাধারণ যুদ্ধ নয়, বরং স্বাধীনতা হারিয়ে ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের কবলে পড়ার এক করুণ কাহিনি। নবাব সিরাজউদ্দৌলার (১৭২৮-১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দ) বিরুদ্ধে পরিচালিত এ যুদ্ধ একদিনের হলেও নানা মাত্রায় ছড়িয়ে ছিল ষড়যন্ত্র। ইংরেজ বেনিয়ারা এ ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছিল দেশীয়দের হাত ধরেই। ১৭৫৬ সালের ১৫ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে মাতামহ নবাব আলীবর্দী খাঁ প্রদত্ত নবাবির দায়িত্ব পালনের শুরুতেই যুবক সিরাজউদ্দৌলা আক্রান্ত হন দেশীয় শত্রু দ্বারা। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ক’জন হলেন সেনাবাহিনীর প্রধান মীরজাফর, দেশীয় বণিক রায়দুর্লভ, জগৎশেঠ, উর্মিচাঁদ এবং কতিপয় ঘরের শত্রু, বিশেষ করে খালা ঘসেটি বেগম। ইংরেজ বণিকদের কূটচালে ধরা দিয়ে এরা নবাবের অভ্যন্তরীণ শাসন দুর্বল করে। পলাশীর যুদ্ধের সেই দিনে এরা নবাবের বিরুদ্ধে ইংরেজদের পক্ষ নিয়ে স্বাধীন বাংলার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত করে। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া এ প্রবন্ধের লক্ষ্য নয় বরং সেই সময়ের সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক কী কী কাঠামোগত মিল রয়েছে এবং এ থেকে কী শিক্ষা নেওয়া দরকার, সে বিষয়ে সংক্ষেপে কিছু কথা উপস্থাপনই এর মূল লক্ষ্য।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথমে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে ১৬৫১ সালে বাংলায় প্রবেশ করে। এ সালে তারা বাংলার সুবেদার শাহ সুজার কাছ থেকে অনুমতি লাভ করে এবং হুগলিতে তাদের প্রথম বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। এরপর ১৬৫৮ সালে তারা কাশিমবাজার, পাটনা ও রাজমহলে বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে তোলে। সম্পদ নিয়ন্ত্রণ ও একচেটিয়া বাণিজ্যের মাধ্যমে তারা শক্তি বৃদ্ধি করে এবং একপর্যায়ে দেশদ্রোহীদের সহায়তায় রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে বাংলার ঔপনিবেশিক শাসক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।
বর্তমানে পরাশক্তি এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগিতার আদলে দেশীয় বাণিজ্য ও অবকাঠামো নির্মাণে সম্পৃক্ত হচ্ছে। গবেষকরা একে নব্য উপনিবেশবাদ হিসাবে আখ্যায়িত করেন। প্রশ্ন থেকে যায়, এই বাণিজ্য ও অবকাঠামো নির্মাণ সহায়তার আড়ালে রাজনৈতিক ক্ষমতা বিলীন তথা দেশের সার্বভৌমত্ব হারানোর ঝুঁকি আছে কিনা? এগুলো কি কৌশলগত বিনিয়োগ? এগুলো কি ঋণ ফাঁদ? এসব নিয়ে ভাবতে হবে। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ইংরেজ বণিকদের বিনা শুল্কে বাণিজ্য সুবিধা দিয়েছিল, যার অপব্যবহার করেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তারা বিনা অনুমতিতে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের সংস্কারের নামে নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছিল। পাশাপাশি নবাবকে ক্ষমতাচ্যুত করে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করার জন্য স্থানীয় বণিক ও অভিজাতদের আর্থিক সুবিধা ও দুর্নীতির লোভ দেখিয়ে তাদের পক্ষে নিয়ে গিয়েছিল। ষড়যন্ত্র ও পরনির্ভরশীলতার সেই কলঙ্কিত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি আমরা দেখেছি গত ১৬/১৭ বছর। বর্তমান সরকার ইতিহাসের অনাকাঙ্ক্ষিত পুনরাবৃত্তির বিষয়ে কতটা সচেতন আছে-তার ওপর নির্ভর করবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ভবিষ্যৎ।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ের গবেষকরা মনে করেন, পরাশক্তিগুলো বিশাল অঙ্কের ঋণ প্রদান করে। সরকারি অব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় দুর্নীতিবাজদের কারণে সেই ঋণ একপর্যায়ে মরণফাঁদ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। বন্দর ও অবকাঠামো লিজ নেওয়ার মাধ্যমে পরাশক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে আর ঋণগ্রহীতা দেশগুলো হারায় তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, এমনকি জীবন। নবাবের ক্ষেত্রে তাই ঘটেছিল। সিরাজউদ্দৌলার পরিবারেই মোহাম্মদী বেগ আশ্রিত হিসাবে ছিল। তাই নবাবের সঙ্গে বেগের সখ্য ছিল। অথচ মীরজাফরের পুত্র মীরনের নির্দেশে ১৭৫৭ সালের ৩ জুলাই মোহাম্মদী বেগ জাফরগঞ্জ প্রাসাদের একটি কক্ষে নবাবকে নির্মমভাবে হত্যা করে। সেদিন স্বার্থের কাছে সখ্য তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জুলাই গণঅভ্যুত্থান