১৯৮৮-এর বন্যার পর ‘বন্যা ব্যবস্থাপনা’য় কোনো পরিবর্তন এসেছে কি?
ঝড়, বন্যা কিংবা অন্য যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ যখন ঢাকাকে স্পর্শ করে, তখনই যেন আমাদের সম্বিত ফিরে আসে। ১২ জুলাই ঢাকায় যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং যেভাবে নগরীর বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে, তা দেখে ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার কথা মনে পড়ে গেল। বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বন্যা ছিল ১৯৮৮ সালের বন্যা। তখন দেশের বড় একটি অংশ, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা, দীর্ঘ সময় পানির নিচে ছিল।
সেই বন্যায় প্রাণ হারিয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কৃষি, যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রায় সব খাত। তবে সেই বিপর্যয় বাংলাদেশের বন্যা ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন ভাবনার সূচনা করেছিল। ১৯৮৮ সালের বন্যার পর ঢাকার পশ্চিমাঞ্চল রক্ষায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, প্রতিরক্ষা অবকাঠামো, স্লুইসগেট, পাম্পিং স্টেশন এবং জলনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পরে এগুলোর অনেকগুলো বাস্তবায়নও হয়।
তবে তখনই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছিলেন, শুধু বাঁধ নির্মাণ করলেই বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কার্যকর বন্যা ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজন উন্নত বন্যা পূর্বাভাস, নিয়মিত নদী খনন, নদীতীর সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষা, টেকসই নগর পরিকল্পনা এবং দুর্যোগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি। বন্যা ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকি মূল্যায়নে ১৯৮৮ সালের অভিজ্ঞতা আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, গত ৩৮ বছরে আমরা কতটা এগোতে পেরেছি?
এই সময়ে দেশের জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নগরায়ণ বিস্তৃত হয়েছে, কিন্তু কমে গেছে জলাভূমি। নদী ও খাল ভরাট করে গড়ে উঠেছে আবাসন প্রকল্প, শিল্পকারখানা এবং নানা ধরনের স্থাপনা। কঠিন বর্জ্যের স্তূপ বেড়েছে, অথচ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এখনো অনেক ক্ষেত্রে অপ্রতুল। এক কথায় বলা যায়, টেকসই নগর পরিকল্পনা নিশ্চিত করা যায়নি। নদী ও বন্যা ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও সমন্বিত পরিকল্পনারও ঘাটতি রয়েছে। অবশ্য একটি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে—বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন।
চলতি বছর দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি আবারও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম, তিন পার্বত্য জেলা, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। কয়েকটি নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। নিম্নাঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কৃষিজমি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ অবকাঠামোসহ নানা খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশে বন্যা বা অন্য কোনো বড় দুর্যোগ দেখা দিলেই আমাদের তৎপরতা শুরু হয়। কিন্তু প্রস্তুতির বদলে যদি সব উদ্যোগ শেষ মুহূর্তে নেওয়া হয়, তাহলে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমও প্রত্যাশিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ সরকারি উদ্যোগের অপেক্ষায় থাকে। অতীতে বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই স্বতঃস্ফূর্ততা কিছুটা কমেছে বলেই মনে হয়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- দুর্যোগ মোকাবেলা