বঙ্গোপসাগর থেকে কুনমিং করিডর
একুশ শতকের রাষ্ট্রগুলো ভৌগোলিক সীমানা দ্বারা নির্ধারিত বিচ্ছিন্ন কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়। রাষ্ট্র এখন বিশ্বায়ন, ডিজিটাল বিপ্লব, উৎপাদনের আন্তর্জাতিকীকরণের অংশ। বৈশ্বিক আন্তঃনির্ভরশীল অর্থনীতির ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির চরিত্র মৌলিকভাবে বদলে গেছে এবং রাষ্ট্রের রূপ-চরিত্রও পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে বর্তমান আমলের রাষ্ট্রগুলোর শক্তি শুধু তাদের সামরিক সক্ষমতা বা ভূখণ্ডের আয়তনে সীমাবদ্ধ নেই। বরং তারা কতটা কার্যকরভাবে বৈশ্বিক সংযোগ (Connectivity), সরবরাহ শৃঙ্খল (Global Supply Chains) এবং অর্থনৈতিক করিডর (Economic Corridors)-এর সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে পেরেছে, তার ওপরও নির্ভর করছে। অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তাত্ত্বিকরা এ নতুন বাস্তবতাকে ভূঅর্থনীতির যুগ (Age of Geoeconomics) বলে অভিহিত করেন, যেখানে অবকাঠামো, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বন্দর, রেলপথ, জ্বালানি এবং তথ্যপ্রবাহ-সবই রাষ্ট্রক্ষমতার কৌশলগত উপকরণে পরিণত হয়েছে।
এ পরিবর্তনকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সাহিত্যে Connectivity Diplomacy, Geoeconomic Statecraft এবং Infrastructure Geopolitics-এর উত্থান হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়। অর্থাৎ, রাষ্ট্রগুলো আর কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে নয়, বরং সড়ক, রেলপথ, সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ গ্রিড, ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক এবং অর্থনৈতিক করিডর নির্মাণের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে। ফলে একুশ শতকের ক্ষমতার রাজনীতিতে ট্যাংক ও যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি মহাসড়ক, গভীর সমুদ্রবন্দর, কনটেইনার টার্মিনাল, লজিস্টিকস হাব এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলও সমান গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক করিডর আর কেবল পরিবহণ অবকাঠামো নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক ভূঅর্থনৈতিক স্থাপত্য (Geoeconomic Architecture)। একটি সফল করিডর একইসঙ্গে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, উৎপাদন, জ্বালানি, ডিজিটাল সংযোগ, সীমান্ত-বাণিজ্য, নগরায়ণ এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একীকরণকে ত্বরান্বিত করে। তাই করিডরের প্রকৃত মূল্য কেবল এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পণ্য পরিবহণে নয়। বরং নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল সৃষ্টি, বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলে (Global Value Chains) অন্তর্ভুক্তি এবং রাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করার মধ্যে নিহিত।
এ কারণেই আজকের বিশ্বে ভূগোল আর ভাগ্যের নির্ধারক নয়। ভূগোলকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের সক্ষমতাই একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে। যে রাষ্ট্র তার ভৌগোলিক অবস্থানকে সংযোগ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই বৈশ্বিক ক্ষমতার নতুন মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। বাংলাদেশের মতো বঙ্গোপসাগরীয় একটি রাষ্ট্রের জন্য এ বাস্তবতা একইসঙ্গে এক বিরাট সুযোগ এবং একটি কৌশলগত দায়িত্ব। এখানেই সদ্য প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার-কুনমিং অর্থনৈতিক করিডরের গুরুত্ব কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক, ভূকৌশলগত এবং ভূঅর্থনৈতিক অবস্থান পুনর্নির্ধারণের সম্ভাবনাও বহন করে।
এমন এক বিশ্ব বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তোলার প্রস্তাব উত্থাপিত হওয়া নিছক আরেকটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক মানচিত্র পুনঃলিখনের একটি সম্ভাবনাও বটে। এটি এমন এক কৌশলগত উদ্যোগ, যা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান কেবল মানচিত্রের একটি অবস্থান হিসাবে নয়, একটি অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে নতুনভাবে মূল্যায়িত হবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সীমানা
- বিশ্ব রাজনীতি
- ভৌগোলিক