চট্টগ্রামের দুর্যোগ: বানভাসির কান্না আমাদের কানে কতটা পৌঁছাল
চট্টগ্রাম ডুবে গেছে। সাধারণত চট্টগ্রাম ডুবে যাওয়া বলতে আমরা বুঝি শহরের জলাবদ্ধতা। এই জলাবদ্ধতা নিয়ে কত আলোচনা–সমালোচনা, দোষারোপ, মিম–ট্রল। আর জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কত খবরাখবর।
এবার শুধু জলাবদ্ধতা নয়, ভারি বৃষ্টিপাতে ভেসে গেছে চট্টগ্রামের দক্ষিণের বিশাল অঞ্চল। সেই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা। পানিতে তলিয়ে গেছে একের পর এক গ্রাম। হাজার হাজার কৃষক আর খামারিদের চোখে অন্ধকার। লাখ লাখ মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছেন। বানভাসি সেসব মানুষের কান্না কতটা পৌঁছাল আমাদের কানে?
কেন এই আকস্মিক বন্যা? ভারী বৃষ্টিপাতের প্রায় অর্ধশত বছরের রেকর্ড ভেঙে গেছে। আসমান ভেঙে যেন সমুদ্র নেমে এসেছে। একেকটা ঘণ্টায় একেকটা বিশাল পুকুর ওপর থেকে আছড়ে পড়ছে যেন জমিনে। আর জমিনের ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, বিল–পুকুর, খেতখামার, স্কুল–কলেজ, মসজিদ–মন্দির, অফিস–আদালত, দোকান–হাট, হাসপাতাল–ক্লিনিক—সবকিছু থই থই পানিতে ডুবে একাকার। সব পরিচয় এসে একশব্দে যেন মিলেছে—ভাসমান। কবরের ভেতরেও পানি ঢুকে লাশ ভেসে উঠেছে, এমন খবরও দেখা যাচ্ছে।
অনেক মানুষ টিনের চালে আশ্রয় নিয়েছে। দুর্গম এলাকাগুলোতে ত্রাণ পৌঁছায়নি। বান্দরবানে অনেক মানুষ কয়েক দিন ধরে পাহাড়ের বনে আশ্রয় নিয়েছে। এক পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর মায়ের আকুতি: ‘আমরা না খেয়ে থাকতে পারব, শিশুদের জন্য একটু ভাত চাই।’
বৃষ্টির কোনো থামাথামি নেই। টানা এক সপ্তাহ বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছে। আরও কয়েক দিন ধরে পড়ে যাবে জানা যাচ্ছে। এমন টানা বৃষ্টি দেখলে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের কালজয়ী উপন্যাস ‘নিঃসঙ্গতার এক শ বছর’-এর মাকোন্দো গ্রামের কথা মনে পড়ে যায়। কয়েক বছর ধরে টানা বৃষ্টি হয়েছিল যেখানে। মাকোন্দোর আকাশ যেন চট্টগ্রামের ওপর ভর করেছে।
গত তিন-চার বছরে এ অঞ্চলে এই নিয়ে তিনটি বড় বন্যা হলো। ২০২৩ সালের আগস্টে পার্বত্য চট্টগ্রাম, দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা ডুবে গিয়েছিল। বান্দরবান শহরের দোতলা ভবন পর্যন্ত পানি ছুঁয়েছিল। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন ভয়াবহভাবে বেঁকে গিয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রামের আরেক দিকে ফেনী-নোয়াখালী-মিরসরাই এলাকাসহ খাগড়াছড়ি পর্যন্ত যে ভয়াবহ বন্যা তা পুরো দেশবাসীকে নাড়া দিয়েছিল। এবার বড় বন্যা দেখা গেল। সেই সঙ্গে আছে পাহাড়ধসের ঘটনা। পাহাড়ধস ও পানিতে পড়ে বেশ কয়েকটি শিশুসহ ৪০ জনের মতো প্রাণহানি ঘটেছে।
দেশের উত্তরবঙ্গ তথা রংপুর, কুড়িগ্রাম এবং খুলনা, বরিশাল ও সিলেট অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখতে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের নতুন বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। আগের দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চলও।
১৯৯১–এর মরণঘাতী ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের ২৫ বছর পর ২০১৬ সালের রোয়ানু ঘূর্ণিঝড় চট্টগ্রামের উপকূলের কিছু অংশ আঘাত হেনেছিল। মনে আছে রোয়ানুর সময় চট্টগ্রাম শহর থেকে বাঁশখালীর ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলে যাওয়া হয়েছিল কয়েকবার। ত্রাণ কার্যক্রম ও মেডিক্যাল ক্যাম্পের পাশাপাশি রিপোর্টিংয়ে বেশ কয়েক দিন কেটেছিল সমুদ্রের পাড়ে। অতিবৃষ্টির ফলে পাহাড়ি ঢল মাতামুহুরী নদী ছাপিয়ে গেলে কক্সবাজার জেলার কিছু এলাকা প্রায় বছর প্লাবিত হতো। এ ছিল কয়েক বছর আগপর্যন্ত এখানকার প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোটামুটি স্বাভাবিক চিত্র। কিন্তু কেন এই নতুন বাস্তবতা তৈরি হলো?
আবহাওয়াবিদ ও গবেষকেরা বলেন, লঘুচাপের কারণে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ দেখা দিয়েছে। বিপুল পরিমাণ জলীয়বাষ্পসমৃদ্ধ মৌসুমি বায়ু জমেছে। এসব কারণে ভারত, মিয়ানমার, বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় দেখা দেয় অতিবৃষ্টি। আর এই অতিবৃষ্টির ঢলের শিকার হচ্ছে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা।
রেকর্ড বৃষ্টি না হোক, অতিবৃষ্টির ঘটনা তো নতুন না, আগে তো এমন বন্যা পরিস্থিতি দেখা যায়নি? এখন কেন সেটি নিয়মিত ঘটতে শুরু করেছে? এর সহজ উত্তর হচ্ছে, অতিবৃষ্টির পানি ধরে রাখার যে বিশাল পাহাড়ি এলাকা, অনেকগুলো বনাঞ্চল—সেখানে বড় ধরনের গড়বড় ঘটে গেছে।
পাহাড়ে একদিকে অপরিকল্পিত বনায়ন, অন্যদিকে বন উজাড় করে কৃষিবান্ধবহীন বিভিন্ন চাষ ও ফলের বাগান, গাছ ও পাহাড়ি ছড়ার পাথর পাচার চলছে দেদার। সেই সঙ্গে আছে অপরিকল্পিত উন্নয়ন। শুধু চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন বানাতে কাটতে হয়েছে কয়েক লাখ গাছ, পাহাড় কাটতে হয়েছে ২৬ কিলোমিটার।