ঝরে পড়াদের নিয়ে ভাবতে হবে
আমার এক সিনিয়র বন্ধু একটি কলেজের অধ্যক্ষ। পেশাগত জীবনে বেশ সফল। নিয়মশৃঙ্খলার বিষয়ে খুবই কঠোর মনের মানুষ তিনি। তাঁর সাবেক কর্মস্থল কলেজে শিক্ষার্থীদের ভর্তির শর্ত আরোপ করেছিলেন—কোনো বিবাহিত ছাত্র-ছাত্রী তাঁর প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাবে না। শুধু তা-ই নয়, কলেজে পড়ার সময় কারও বিয়ে হলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হবে। তারপরও ছাত্রীদের বিয়ে দিয়ে দেওয়ার বিষয়টি যখন তাঁর নজরে আসে, তখন তিনি শর্তসাপেক্ষে বেশ কয়েকটি বিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সুফলও পেয়েছিলেন। তবে শুধু বিয়ে বন্ধ করেই তিনি শিক্ষার্থীদের ধরে রেখেছিলেন, এমনটি বলাও ঠিক হবে না। কলেজের পরিবেশকে তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী করে তুলেছিলেন। একই সঙ্গে অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়, তাঁদের বাড়িতে যাওয়ার মতো কাজও করেছিলেন। সবকিছুই করেছিলেন শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের আশায় এবং ঝরে পড়া বন্ধ করার উদ্দেশ্যে। তাঁর কলেজে ঝরে পড়ার হার ছিল শূন্য। অন্যদিকে, নিয়মশৃঙ্খলা ও শিক্ষাদানে আন্তরিকতার কারণে কলেজটি প্রতিষ্ঠার তিন-চার বছরের মধ্যেই কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সেরা ছয়টি কলেজের মধ্যে স্থান করে নেয়। পরবর্তীকালে তা তৃতীয় থেকে পঞ্চম স্থানের মধ্যেও অবস্থান করতে সক্ষম হয়েছিল।
বাংলাদেশে এমপিওভুক্ত ৪,০০৭টি কলেজের মধ্যে এটি একটি মাত্র। হয়তো এমন আরও হাতে গোনা কিছু কলেজ থাকতে পারে। বাকি অধিকাংশ কলেজেই শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার সংখ্যা আশঙ্কাজনক। যার চিত্র বেরিয়ে এসেছে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করার তথ্য থেকে। ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে ১৫ লাখ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল। তাদের সবাই এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে—এটাই প্রত্যাশিত ছিল। তারপরও বিভিন্ন দৈবদুর্বিপাকের কারণে হয়তো ২ থেকে ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়াটা অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা যখন ৩৬ শতাংশে পৌঁছে যায়, তখন তা অবশ্যই উদ্বেগের কারণ। শুধু পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকাই নয়, পরীক্ষার প্রথম দিন অংশ নিয়েও অনেকে দ্বিতীয় বিষয়ে আর আসেনি। এবারের গণমাধ্যম সেই উদ্বেগজনক তথ্যই দিচ্ছে।
এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার কারণ কী? শুরুর দিকেই কি বিষয়টি বোঝা যায়নি? গত দুই বছরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারের নজরদারি কিংবা পর্যবেক্ষণ কি অনুপস্থিত ছিল? সবচেয়ে বড় কথা, এত বড় ঘটনা চুপিসারে ঘটে গেছে—এমনও নয়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার আঁচ কীভাবে শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়েছে, সেটা কারও অজানা ছিল না। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অধিকাংশই হয়তো অসচেতন, কিন্তু যারা শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনা করেন, তাঁরা কি বুঝতে পারেননি শিক্ষার্থীদের ওপর সেই অস্থিরতা কতটা প্রভাব ফেলতে পারে?
মাত্র কয়েক বছর আগে করোনার আঘাতে আমাদের শিক্ষার্থীদের মাথায় বড় ধাক্কা লেগেছিল। সেই ক্ষতি নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু তখনও সময় হারিয়ে সমালোচনা হয়েছে। ২০২৪ সালের পরও শিক্ষার্থীদের বিষয়ে সরকার কিংবা সংশ্লিষ্টরা একইভাবে বেখেয়াল ছিল। শুধু রাজনীতিই নয়, একটি প্রজন্মের ওপর আঘাত হিসেবে আর্থসামাজিক অব্যবস্থাও বড় ধরনের ক্ষতি করেছে।
তাত্ত্বিক আলোচনা বাদ দিয়ে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি নিয়ে আরও বলতে চাই। কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মাধবপুর আবু জাহের ফাউন্ডেশন কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ আব্দুল কাইউমের সঙ্গে নিবন্ধ লেখার সময় কথা হয়। তাঁর কলেজ থেকে দ্বিতীয় বছরের মতো এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে এইচএসসিতে ভর্তি হয়েছিল ৯২ জন। তাঁদের মধ্যে মাত্র ১৩ জন ছিল ছাত্র, বাকিরা ছাত্রী। এই ৯২ জনের মধ্যে মাত্র ৩৮ জন এবার পরীক্ষা দিচ্ছে। অর্থাৎ তাঁর কলেজে ঝরে পড়ার হার ৪১.৩ শতাংশেরও বেশি। এর মধ্যে মোটা দাগে দুটি কারণ হলো—ছাত্রীদের বিয়ে হয়ে যাওয়া এবং শিক্ষার্থীদের কলেজে অনুপস্থিতি। সামাজিক বাস্তবতায় বিয়ে রোধ করা সব সময় সম্ভব নয়। কিন্তু অনুপস্থিতি কমাতে গিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা সুখকর নয়।
দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকের ফোন পেয়ে কোনো কোনো অভিভাবক এমনও বলেছেন, ‘পরীক্ষার আগে টাকা পেলেই তো হয়, এখন ছেলে ব্যস্ত রাজনীতির কাজে।’ শিক্ষার্থীদের ফোন করলে বিরক্ত হওয়ার কথাও কেউ কেউ জানিয়েছেন। কিছু শিক্ষার্থী লেখাপড়া ছেড়ে বিদেশে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ঝরে পড়া
- কলেজ শিক্ষার্থী
- এমপিওভুক্তি