কেপ ভার্দেকে দেখে বাংলাদেশ কি সেই গুলতিটা খুঁজে পাবে?
বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশ যেন কয়েক সপ্তাহের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবলপ্রেমী দেশগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
আমাদের দল নেই, আমাদের পতাকা নেই, তবু আমাদের আবেগ আছে। গভীর রাত পর্যন্ত খেলা দেখি, তর্ক করি, আনন্দে মিছিল করি, পরাজয়ে মন খারাপ করি। আমরা যেন অন্যদের স্বপ্নে নিজেদের অংশ খুঁজে নিই। এটি যে নতুন ঘটনা তা নয়।
৪০ বছর আগে আমি যখন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম তখনো আমরা বিশ্বকাপের জন্য পরীক্ষা পেছানোর আন্দোলন করেছি। এখনতো বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে, মাল্টিপারপাস হলে দল বেঁধে খেলা দেখার চল চালু হয়েছে।
বিশ্বকাপ ফুটবল এখন একটা খেলার বিশ্বকাপ নয়। এই সময় জুড়ে পুরো বিশ্বই এক উন্মাদনায় যুক্ত হয়ে যায়। ফুটবলের কলা-কৌশল, হারজিত ছাপিয়ে এটি হয়ে উঠে বিশ্বকে এক সুতায় বাধার উপলক্ষও। হয়তো এ কারণে এটি এখন গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ।
আগের মতো এখন আর রাত জেগে খেলা দেখা হয় না। প্রথম আলো অনলাইনের সরাসরিতে ঢুঁ মারা, পরদিন খেলার পাতাতে বিশ্লেষণ পড়া এবং কখনো কখনো নানা জায়গাতে উৎসাহী দর্শকদের খেলার আলোচনাতে কান পেতেই খুশি থাকতে হয়।
তবে, শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে উঠে ‘রুদ্ধশ্বাস খেলায় মেসির দলের জয়’ এর খবর পড়ে শুধু মন ভরেনি। বড় পর্দায় হাইলাইটস দেখারও আগ্রহ জন্মেছে।
আর্জেন্টিনা-কেপ ভার্দে ম্যাচের হাইলাইটস, বিশ্লেষণ আর ম্যাচ-পরবর্তী আলোচনা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, এটি শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়, হয়তো রাষ্ট্রকৌশলেরও একটি গল্প।
সকালের ম্যাচ রিপোর্ট পড়ার সময় আর হাইলাইটস দেখতে দেখতে প্রথমে মনে পড়েছে গোলিয়াথের সঙ্গে ডেভিডের লড়াইয়ের গল্প। বাইবেলে বর্ণিত এই কাহিনিতে আমরা দেখি দুর্ধর্ষ যোদ্ধা গোলিয়াথের বিরুদ্ধে তরুণ রাখাল ডেভিডের ‘অসম লড়াই’।
ডেভিড জানতেন শক্তিতে গোলিয়াথের সঙ্গে পারা যাবে না। খুঁজে বের করতে হবে তার দুর্বল জায়গা (অনাবৃত কপাল) এবং সুযোগ পাওয়া যাবে সম্ভবত ‘মাত্র একটা’। কাজে তাঁর কৌশল ছিল ভিন্ন আর অস্ত্র কিন্তু তলোয়ার ছিল না। ছিল ‘গুলতি’। আর সেই গুলতি দিয়ে ডেভিড এই অসম লড়াইয়ে জয়ী হয়েছেন।
সাধারণত এই গল্পের শিক্ষা হিসেবে বলা হয় ছোটরাও বড়দের হারাতে পারে। সেটা খেলার মাঠ হোক, প্রযুক্তির জগৎ হোক কিংবা ব্যবসার বাজার হোক। কিন্তু আসল শিক্ষা সম্ভবত আরও গভীরে।
ডেভিডের আসল শক্তি গুলতি ছিল না। তার আসল শক্তি ছিল কোন খেলাটা খেলতে হবে আর কোনটা খেলতে হবে না, সেটা বোঝার ক্ষমতা। বিশেষ করে ডেভিড বুঝেছিল, গোলিয়াথকে গোলিয়াথের খেলায় হারানো যাবে না। খেলাটা পাল্টে দিতে হবে।
স্কোরলাইন বলছে, আর্জেন্টিনা ৩-২ গোলে কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে জিতেছে। ইতিহাসও এই ফলটাই মনে রাখবে। কিন্তু যারা ম্যাচটি দেখেছেন, তারা জানেন, এটি কেবল জয়-পরাজয়ের গল্প নয়।
এটি ছিল আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের পাঁচ-ছয় লাখ মানুষের একটি ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রের এমন এক লড়াই, যা বিশ্বকাপের অনেক জয়ের চেয়েও বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আমার মতো অধুনা খেলায় অনাগ্রহীদেরও আকৃষ্ট করেছে গুগল করে কেপ ভার্দে সম্পর্কে জানতে, তাদের গোলরক্ষক ভোজিনহো’র সম্পর্কে জানতে, কেপ ভার্দের কোচের কৌশলের কথা ভাবতে।
কেপ ভার্দের এই সাফল্য, আমার মতে, কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। দেশটির জনসংখ্যার চেয়েও বড় তাদের প্রবাসী জনগোষ্ঠী। ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কেপ ভার্দীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের খুঁজে এনে জাতীয় দলে যুক্ত করা হয়েছে। তাঁরা ইউরোপের একাডেমিতে বেড়ে উঠেছেন, বিশ্বের সেরা লিগে খেলেছেন, কিন্তু বেছে নিয়েছেন নিজেদের শিকড়ের দেশের জার্সি।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬