শিক্ষার্থীরা কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে?
মাসখানেক আগে এক বন্ধুর ফোন পেয়েছিলাম। তিনি একটি মফস্বল কলেজের অধ্যক্ষ। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্তর্বর্তীকালীন শাসন এবং নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের সূচনার মধ্য দিয়ে নানা প্রতিকূলতা সামলে কীভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হয়েছে, সে অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন। এরপর বললেন, কলেজের অবকাঠামো, শিক্ষকসংকট ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কথা। আলোচনার একপর্যায়ে জানতে চাইলাম, করোনা মহামারী ও ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীরা কি আবার নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে? তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “পড়াশোনা কেমন করছে, সেটি তো পরের প্রশ্ন; শিক্ষার্থীরা ক্লাসেই আসে না।”
কয়েক দিন পর একই কথা শুনলাম একটি জেলা শহরের সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষের কাছেও। তার ভাষায়, অবকাঠামো বা শিক্ষকসংকটের চেয়ে এখন বড় সংকট হলো শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা। প্রথমে বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা মনে হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিয়েছে, এটি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে উদ্ভূত এক গভীর ও নীরব সংকট।
বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনায় সাধারণত ফলাফল, পাসের হার, জিপিএ-৫ কিংবা প্রশ্নপত্রের মান নিয়েই বেশি কথা হয়। কিন্তু ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ভিন্ন এক বাস্তবতা সামনে এনেছে—পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগেই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষার মূলধারা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেশি। দুই বছর আগে একাদশ শ্রেণিতে প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী নিবন্ধন করলেও পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছে মাত্র সাড়ে ৯ লাখ। বোর্ডভিত্তিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ৫৪.৬ শতাংশ, আলিমে ৪৪ শতাংশ এবং সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষার জন্য ফরমই পূরণ করেনি। যারা ফরম পূরণ করেছে, তাদের মধ্যেও অনুপস্থিতির হার বেড়েছে। পরীক্ষার প্রথম দিন ২৪ হাজার ৭৮৪ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল, যা গত দুই বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
প্রশ্ন হলো, এই শিক্ষার্থীরা কোথায় গেল?
এটি কেবল একটি শিক্ষা-পরিসংখ্যান নয়; এটি বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। কারণ, একজন শিক্ষার্থী যখন পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে পারে না, তখন শুধু একটি পরীক্ষা হারিয়ে যায় না; হারিয়ে যেতে থাকে একটি সম্ভাবনা, একটি দক্ষ মানবসম্পদ এবং একটি পরিবারের উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্ন। এ কারণেই এই সংকটকে কেবল পরীক্ষার ফল বা পাসের হারের আলোকে নয়, রাষ্ট্রের মানবসম্পদ উন্নয়ন, শ্রমবাজার এবং সামাজিক নীতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
একজন শিক্ষার্থী যখন এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় না, তখন সেটি কেবল একটি পরীক্ষা থেকে অনুপস্থিত থাকার ঘটনা নয়। এর পেছনে থাকতে পারে অর্থনৈতিক সংকট, শ্রমবাজারে আগাম প্রবেশ, বিদেশমুখিতা, বাল্যবিবাহ, টেস্ট পরীক্ষায় বাদ পড়া, কিংবা মানসিক চাপ ও শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি অনাগ্রহ। প্রতিটি অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর পেছনে রয়েছে একটি অসমাপ্ত শিক্ষাযাত্রার গল্প।
প্রতি বছরই কিছু শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। কিন্তু এবার সংখ্যাটি অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; করোনা মহামারীর পর শেখার ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি, শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার সম্মিলিত ফল। অর্থাৎ, এইচএসসি পরীক্ষার অনুপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা সংকটের দৃশ্যমান বহিঃপ্রকাশ।
এই সংকটের প্রথম কারণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা। মূল্যস্ফীতি, পারিবারিক আয়ের সংকোচন, পরিবার প্রধানের কর্মহীন হয়ে পড়া বহু নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে, যেখানে সন্তানের শিক্ষার চেয়ে তাৎক্ষণিক আয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে অনেক শিক্ষার্থী অল্প বয়সেই শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, ক্ষুদ্র ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে বা বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে শ্রেণিকক্ষের পরিবর্তে কর্মক্ষেত্রই তাদের কাছে অধিক প্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে।
তবে বিষয়টি শুধু দারিদ্র্যের নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকটেরও। উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়লেও সেই অনুপাতে মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জনের পরও দীর্ঘদিন বেকার থাকার বাস্তবতা অনেক তরুণকে দীর্ঘ একাডেমিক শিক্ষার মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করছে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে দৃশ্যমান সংযোগ দুর্বল হলে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে।
শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরেও কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা, মুখস্থবিদ্যা ও কোচিংনির্ভর সংস্কৃতি শেখার আনন্দকে ক্ষীণ করেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে টেস্ট পরীক্ষাকে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, ফলে দুর্বল শিক্ষার্থীরা উন্নতির সুযোগ না পেয়ে মূলধারা থেকেই ছিটকে পড়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শিক্ষার্থীকে বাদ দেওয়া নয়, তাকে শেখার উপযোগী করে তোলা।