তুরাগ ট্র্যাজেডি: পুরোনো বন্দোবস্তে নতুন চাল
বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, নির্যাতন-নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের মতো কোনো ঘটনা ঘটলে সেই ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা বেশ পুরনো। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীকালেও পুরোনো ওই বন্দোবস্ত থেকে বেরুবার কোনো চেষ্টা দেখা যায়নি, বরং এমন কিছু বিষয় সামনে আসছে, যা দেখে মনে হচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থেকে আরও দূরে সরে যাচ্ছি আমরা। তুরাগে ছাত্রলীগের ঘটনার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি; সেখানে নির্মোহ বিশ্লেষণের চেয়ে রাজনৈতিক তর্কই প্রধান হয়ে উঠেছে। পক্ষপাতের আড়ালে তুরাগে ছাত্রলীগের সঙ্গে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে সঠিক অনুসন্ধান যেমন হচ্ছে না, তেমনি সমালোচনার আধিক্যে তলানিতে গিয়ে ঠেকছে প্রাসঙ্গিক বিষয়। এরই ফাঁকে তুরাগে ডুবে মরা সুমনদের মতো ডুবতে চলেছে মানবাধিকারও।
চব্বিশে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর বিচারবহির্ভূত নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের নীরবতা একধরনের সম্মতি তৈরি করছে। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকর্মীদের নিশ্চুপ ভূমিকার সমান্তরালে এই সব নির্যাতন-নিপীড়নের খবর প্রকাশে সংবাদমাধ্যমের দ্বিধা দেখে মনে হচ্ছে বিগত দিনের মতো এখনও অঘোষিত নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আটকে আছে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। তবে মূলধারার সংবাদমাধ্যম এড়িয়ে গেলেও বর্তমান সময়ে ফেইসবুক ও ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ঠিকই সব জানিয়ে দেয়, যার বড় উদাহরণ সাম্প্রতিক তুরাগ নদীতে ছাত্রলীগ কর্মীর লাশ উদ্ধারের ঘটনা। তবে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে গুজব আর সত্যের পার্থক্য নির্ণয় করা বেশ দুরূহ।
সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ ও ক্ষমতাসীন বিএনপিকে অভিযুক্ত করা হলেও পুলিশ প্রাথমিকভাবে একে 'গুজব ও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডা' বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। এই দাবিতে কিছু অ্যাক্টিভিস্ট ও 'নিউ মিডিয়া'ও সুর মেলায়। তবে নেটিজেনদের তীব্র সমালোচনার মুখে প্রশাসন শেষ পর্যন্ত ঘটনার সত্যতা আংশিক স্বীকার করতে বাধ্য হলেও, তাদের নাটকীয় বক্তব্য নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
তুরাগে ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও প্রকৃত সত্য আড়াল করার চেষ্টা আইনের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এজাহারে নৌকা ভ্রমণ ও অসাবধানতাবশত নদীতে পড়ে যাওয়ার কথা বলা হলেও, প্রথমে পিকনিকে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটার দাবি করা হয়েছিল। পুলিশ একে 'সাঁতার না জানা'র কারণে অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করে ছাত্রলীগের মিছিলের বিষয়টি অস্বীকার করলেও, পরবর্তীতে নিষিদ্ধ সংগঠনটির ৭ জনকে গ্রেপ্তারের কথা স্বীকার করে। গ্রেপ্তার ও মৃত্যু নিয়ে পুলিশের এমন দ্বিচারিতা এবং রাজনৈতিক ভূমিকা প্রশাসনের ওপর জনগণের অনাস্থা তৈরি করছে, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর জন্য বড় হুমকি।
একটু চিন্তা করলে মামলার এজাহারের বক্তব্য যে বেশ গোলমেলে, তা উপলব্ধি করা যায়। মামলার এজাহারে উল্লিখিত নদীর ঘাটে ফেরানো নৌকা থেকে অসাবধানতাবশত পড়ে ডুবে মারা যাওয়ার দাবিটি একেবারেই অবিশ্বাস্য ও অবাস্তব। নদীর তীরে কেউ পানিতে পড়ে গেলে উপস্থিত অন্য কেউ তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করবে না—বাঙালি সমাজের চিরন্তন পরোপকারী স্বভাবের সঙ্গে এটি মোটেও খাপ খায় না।
সোশ্যাল মিডিয়ার ভিডিও, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২২ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিল শেষে ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী নৌকাযোগে যাওয়ার সময় শেখ হাসিনার নামে স্লোগান দেয়। এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের খবর পেয়ে আশুলিয়া বাজারঘাটে পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা অবস্থান নেয় এবং প্রথম ধাপে পুলিশ ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মীকে আটক করে। নৌকার মাঝি নৌকা নিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে বিএনপি কর্মীরা নৌকার রশি টেনে ধরে ভেতরে উঠে পড়ে।
এ সময় নৌকাতেই পুলিশ ও বিএনপির সঙ্গে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তিতে বেশ কয়েকজন নদীতে পড়ে যায়। পুলিশ নদী থেকে সাঁতরে ওঠা কয়েকজনকেও গ্রেপ্তার করে।
সংবাদমাধ্যমের কাছে নিহত সুমনের খালুর দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, সুমন ছাত্রলীগ করত কী না, তা তাদের জানা নেই। ২২ জুন রাতে সুমনের নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর তারা জানতে পারেন যে, আওয়ামী লীগের মিছিল শেষে আশুলিয়া ঘাটে নামার সময় পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলার মুখে অনেকে নদীতে পড়ে গিয়েছে। ওইদিন পুলিশের আটক করা ৭ জনের মধ্যে সুমন ছিল না। ২৩ জুন রাত থেকে তুরাগ নদীতে খোঁজাখুঁজি করে বিফল হন তারা। ২৪ জুন সুমনের সঙ্গে থাকা অন্য দুইজনের লাশ পাওয়া যায়। অবশেষে ২৫ জুন পুলিশের তথ্যের ভিত্তিতে আশুলিয়া ব্রিজের কাছ থেকে সুমনের লাশ উদ্ধার করেন।
পুলিশ এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বক্তব্যের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। পরিবারগুলো স্থানীয় বিএনপি ও পুলিশের ভয়ভীতি এবং হয়রানির অভিযোগ তুলেছে। পুলিশের বিরুদ্ধে নিহত সুমনের বাসায় ভাঙচুর, মোবাইল থেকে রাজনৈতিক ছবি-ভিডিও মুছে ফেলা এবং ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ খোঁজার অভিযোগ উঠেছে। একইভাবে, বিপ্লবের পরিবারও চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণে নিখোঁজ এবং নৌকার মাঝিও আত্মগোপনে আছেন। ভুক্তভোগীদের এভাবে আইনের আশ্রয় না নিয়ে আত্মগোপনে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করা সমাজের ভীতিকর সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তোলে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পেরিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার আদৌ হবে কী না, তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে। কেননা, পরমতঅসহিষ্ণুতা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফাঁদে ঝুলে থাকা বাংলাদেশে এটা অনেকাংশে দুঃস্বপ্নের মতো। বিগত সময়েও বিরোধী মত দমনে গুম ও খুনের শিকার হওয়ার ঘটনার বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত ও বিচার হয়েছে, এমন নজির জানা নেই।
- ট্যাগ:
- মতামত
- মানবাধিকার
- রাজনৈতিক সহিংসতা