সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যগুলো দেশের প্রান্তিক স্বাস্থ্য খাতের এক চরম ও উদ্বেগজনক চিত্র আমাদের সামনে উন্মোচন করেছে। তিনি জানান, উপজেলা পর্যায়ের ৩১০টি সরকারি হাসপাতালে প্রায় ৪৮৫টি এক্স-রে মেশিন এবং ২৫২টি হাসপাতালে ৩৯৫টি আলট্রাসাউন্ড মেশিন অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশই সম্পূর্ণ অকেজো ও মেরামত–অযোগ্য। দেশের কোটি কোটি সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসাস্থল হলো এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো। সেখানে ডায়াগনস্টিক বা রোগনির্ণয়ের এমন মৌলিক যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর বিকল হয়ে থাকা কেবল দুর্ভাগ্যজনকই নয়; বরং চরম প্রশাসনিক অবহেলারই প্রমাণ।
চিকিৎসাসামগ্রীর এই বিকল দশা গ্রামীণ দরিদ্র মানুষকে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চড়া মূল্যের ফাঁদে ফেলছে। এতে একদিকে যেমন মানুষের পকেট কাটছে, অন্যদিকে সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় না হওয়ায় চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয়প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এবং মেরামতযোগ্য যন্ত্রগুলোর জন্য কেবল এখন টেন্ডার করার প্রক্রিয়া আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ধীরগতিকেই স্পষ্ট করে।
যন্ত্রপাতির এই সংকটের সমান্তরালে রয়েছে তীব্র জনবলসংকট। সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের ৯ হাজার ৪০৭টি পদ শূন্য পড়ে আছে। যেখানে চিকিৎসকের ৪১ হাজার পদের বিপরীতে প্রায় এক-চতুর্থাংশই শূন্য, সেখানে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা আশা করা অবাস্তব। স্বাস্থ্য খাতের এই সামগ্রিক ভেঙে পড়া অবস্থার খেসারত দিতে হচ্ছে প্রান্তিক জনগণকে। যার একটি নির্মম প্রতিফলন দেখা যায় মাতৃমৃত্যুর হারে—প্রতি লাখে আনুমানিক ৪ হাজার ৩৫৩ জন মা সন্তান প্রসবকালে মারা যাচ্ছেন, যা যেকোনো সভ্য সমাজের জন্য লজ্জাজনক।
ঢাকায় শয্যার তুলনায় চার-পাঁচ গুণ রোগীর চাপ থাকা কিংবা বছরে ১ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হওয়ার মতো জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের স্বাস্থ্য খাত। এর ওপর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের (এএমআর) মতো নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি চিকিৎসাপ্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে।
আমরা মনে করি, কেবল নতুন করে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বা অবকাঠামো বাড়ানোর পরিকল্পনার মধ্যে সমাধান সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। সবার আগে প্রয়োজন বিদ্যমান ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে দ্রুত এক্স-রে ও আলট্রাসাউন্ড মেশিন সচল করতে হবে, শূন্য পদে চিকিৎসক পদায়ন করতে হবে এবং তদারকি বাড়াতে হবে। দেশের সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে এই উদাসীনতা ও খামখেয়ালি অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত।
- ট্যাগ:
- মতামত
- স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন