অনলাইন জুয়ার বিস্তার: রংপুরের সামাজিক বাস্তবতার পাঠ
আজকাল বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বিস্তার শহরের গন্ডী পেরিয়ে গ্রাম, মফস্বল, সীমান্ত ও প্রান্তিক অঞ্চলেও ভয়াবহ সামাজিক সংকটে পরিণত করেছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগে অনলাইন জুয়ার অ্যাপ, বেটিং প্ল্যাটফর্ম, ক্যাসিনো গেম ও তথাকথিত ‘ইনকাম অ্যাপ’ অস্বাভাবিক হারে ছড়িয়ে পড়েছে। এক সামাজিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, রংপুর বিভাগে অনলাইন জুয়ার অ্যাপের বিস্তার মোবাইল ফোন হাতে থাকা কিশোর থেকে শুরু করে বেকার যুবক, এমনকি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও গৃহিণীরাও এই ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছেন। তারা অনেকই পাবজি, ফ্রিফায়ার, ব্যাং ব্যাং, বেট ৩৬৫, মোবাইল লিজেন্ড, লুডু কিং, ই-ফুটবল, কলঅফ ইত্যাদি ব্যবহার করছেন। কেন রংপুর বিভাগে এই অনলাইন জুয়াখেলার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি তা নিয়ে ভাবনা শুরু হয়েছে। এর পেছনে কি শুধু প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, নাকি আরও গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।
রংপুর বিভাগ ঐতিহাসিকভাবেই দেশের অন্যতম পিছিয়ে পরা অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। অতীতে যখন দেশে কৃষিতে পরিবর্তন ঘটেনি তখন মঙ্গা শব্দটি এই অঞ্চলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। যদিও এখন সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দারিদ্র্য অনেকটা কমেছে, কিন্তু শিক্ষিত, অল্প-শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের স্থায়ী ভিত্তি এখনও দুর্বল। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, মৌসুমি আয়, শিল্পায়নের অভাব এবং উচ্চ যুব বেকারত্ব, এই বাস্তবতা তরুণদের সহজে ঝুঁকিপূর্ণ আয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনলাইন জুয়ার অ্যাপগুলো এই হতাশাকেই মূলধন হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা বিজ্ঞাপনে দেখাচ্ছে, মাত্র ১০০ টাকা বিনিয়োগে হাজার টাকা আয়, ঘরে বসে ইনকাম, লাইভ ক্রিকেট বেটিংয়ে নিশ্চিত লাভ, ইত্যাদি। আর্থিক সংকটে থাকা তরুণদের কাছে এটি তখন শর্টকাট সফলতার পথ মনে হয়।
রংপুর বিভাগের বহু জেলায় শিক্ষিত বেকার যুবকের সংখ্যা উদ্বেগজনক। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ থেকে পাস করার পরও চাকরি না পাওয়া তরুণরা একধরনের মানসিক হতাশা ও সামাজিক চাপের মধ্যে থাকেন। পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে আত্মসম্মানবোধেও আঘাত লাগে। এই অবস্থায় অনলাইন জুয়ার অ্যাপ তাদের কাছে “দ্রুত টাকা উপার্জনের বিকল্প” হিসেবে হাজির হয়। প্রথমদিকে কিছু মানুষ সামান্য লাভও করে, যা অন্যদের উৎসাহিত করে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত ঋণ, হতাশা ও পারিবারিক সংকটে পড়ে আছে।
অনলাইন জুয়ার বিস্তারের সঙ্গে মাদক সমস্যারও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। রংপুর বিভাগের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচারের প্রবণতা রয়েছে। ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল কিংবা বিভিন্ন নেশাজাতীয় দ্রব্য সহজলভ্য হয়ে উঠলে তরুণদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণও বাড়ে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি দ্রুত অর্থের সন্ধান করে এবং বাস্তবতা থেকে পালাতে চায়। অনলাইন জুয়া সেই মানসিক দুর্বলতাকে কাজে লাগায়। আবার জুয়ার কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি হলে অনেকে অপরাধ ও মাদকের দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়ে। ফলে একটি ভয়াবহ চক্র তৈরি হয়ে মাদক, জুয়া, ঋণ, অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয়ের দুষ্টচক্র তৈরীতে সঞায়তা করছে ।
ডিজিটাল প্রযুক্তির সহজলভ্যতাও এই সংকটকে ত্বরান্বিত করেছে। একসময় জুয়া মানে ছিল নির্দিষ্ট আড্ডা বা গোপন আসর। এখন একটি স্মার্টফোন ও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট থাকলেই মানুষ বিশ্বব্যাপী জুয়ার নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। রংপুর বিভাগে ইন্টারনেট ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে, কিন্তু ডিজিটাল সচেতনতা সেই হারে বাড়েনি। অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে তথাকথিত ‘গেমিং অ্যাপ বা বেটিং প্ল্যাটফর্ম’ আসলে অবৈধ জুয়ার মাধ্যম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এসব অ্যাপের গোপন প্রচারণা চলছে। ফেসবুক গ্রুপ, টেলিগ্রাম চ্যানেল কিংবা ইউটিউব ভিডিওর মাধ্যমে তরুণদের প্রলুব্ধ করা হচ্ছে।
রংপুর বিভাগের প্রবাসী পরিবারগুলোর একটি অংশও অনলাইন জুয়ার বিস্তারে পরোক্ষ ভূমিকা রাখছে। মধ্যপ্রাচ্য বা অন্যান্য দেশে কর্মরত স্বজনদের পাঠানো অর্থ অনেক সময় তরুণদের হাতে অবাধে চলে আসে। পর্যাপ্ত পারিবারিক নজরদারি না থাকলে তারা সেই অর্থ অনলাইন বেটিংয়ে ব্যয় করছে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পরিবার বুঝতেই পারেনি কখন ছেলের মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে, কিংবা গোপনে জমি বন্ধক রাখা হয়েছে জুয়ার ঋণ শোধ করতে।
আরেকটি বড় কারণ হলো বিনোদনের সুস্থ পরিবেশের অভাব। রংপুর বিভাগের অনেক উপজেলায় ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বা যুব উন্নয়নমূলক কার্যক্রম সীমিত। বিকেলের খেলাধুলা, পাঠাগার সংস্কৃতি কিংবা সাংস্কৃতিক চর্চা কমে গিয়ে মোবাইলভিত্তিক একাকী বিনোদন বেড়েছে। ফলে তরুণরা সহজেই ভার্চুয়াল জগতের নেশায় ডুবে যাচ্ছে। অনলাইন জুয়ার অ্যাপগুলো মনস্তাত্ত্বিকভাবে এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে ব্যবহারকারী বারবার ফিরে আসে। প্রথমে সামান্য জেতার সুযোগ দিয়ে পরে বড় ক্ষতির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। এটি কার্যত ডিজিটাল আসক্তির একটি রূপ।
- ট্যাগ:
- মতামত
- অনলাইন জুয়া