কাজুবাদাম চাষে নতুন দিগন্ত
বাংলাদেশের কৃষি আজ আর শুধু খাদ্যশস্য উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের পাশাপাশি এখন সময় এসেছে উচ্চমূল্যের বাণিজ্যিক ও রপ্তানিমুখী কৃষি পণ্যের দিকে মনোযোগ দেওয়ার। সেই প্রেক্ষাপটে কাজুবাদাম একটি সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের পাহাড়ি ও উঁচু অনাবাদী ভূমিতে কাজুবাদাম চাষ কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ কাজুবাদাম আমদানি করা হলেও দেশীয় উৎপাদন ছিল খুবই সীমিত। অথচ পার্বত্য অঞ্চলের জলবায়ু, মাটি ও ভূ-প্রকৃতি কাজুবাদাম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর “কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প” বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো অনাবাদী পাহাড়ি জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনা, কৃষকের আয় বৃদ্ধি, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং ভবিষ্যতে রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তোলা।
প্রকল্প কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগে দেশে প্রায় ২ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে কাজুবাদাম চাষ হতো। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলে বর্তমানে এই আবাদ বেড়ে প্রায় ৫ হাজার ২০০ হেক্টরে উন্নীত হয়েছে। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলার বিস্তীর্ণ অনাবাদী পাহাড়ি ভূমিতে এখন কাজুবাদামের বাগান গড়ে উঠছে। আগে যেসব এলাকায় জুম চাষের পর জমি দীর্ঘ সময় অনাবাদী থাকত, সেখানে এখন বাণিজ্যিকভাবে কাজুবাদাম উৎপাদন হচ্ছে।
সরকার শুধু আবাদ সম্প্রসারণেই সীমাবদ্ধ নেই; উন্নত জাত, আধুনিক প্রযুক্তি এবং কৃষক প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে। কৃষকদের হাতে মানসম্মত চারা পৌঁছে দেওয়া, প্রদর্শনী প্লট স্থাপন, মাঠ দিবস আয়োজন, প্রশিক্ষণ প্রদান এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে নতুন নতুন কৃষক ও উদ্যোক্তা এই খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন।
বর্তমানে দেশে কাজুবাদামের ভোক্তা চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের বাজারের আকার প্রায় ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। প্রতিবছর কয়েক হাজার টন প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম আমদানি করতে হয়। এই আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে চাহিদা পূরণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশে ২২টিরও বেশি কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে উঠেছে, যা সম্পূর্ণ বেসরকারি বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত। এর ফলে কৃষকরা সহজে বাজার পাচ্ছেন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হচ্ছে।
কাজুবাদাম খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। বাগান স্থাপন, পরিচর্যা, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের জন্য এ খাত নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোও এখন কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগ করছে, যা ভবিষ্যতে এ খাতকে আরও শক্তিশালী ভিত্তি দেবে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রথমত, দেশীয়ভাবে উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাতের সংখ্যা এখনও সীমিত। দ্বিতীয়ত, অনেক এলাকায় মানসম্পন্ন চারা উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। তৃতীয়ত, পাহাড়ি অঞ্চলে যোগাযোগ অবকাঠামো দুর্বল হওয়ায় উৎপাদিত পণ্য পরিবহন ও বাজারজাতকরণে অতিরিক্ত ব্যয় হয়। এছাড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা, সংরক্ষণ সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মূল্য শৃঙ্খল গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- কাজু বাদাম
- বাণিজ্যিক চাষ