তিন কারণে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বাংলা কিউ.আর

সমকাল জাকারিয়া স্বপন প্রকাশিত: ২১ জুন ২০২৬, ১৬:৪৯

কিউ.আর কোড দিয়ে দোকানে পেমেন্ট করার প্রথা নতুন নয়। যারা বাংলাদেশে মোবাইল ওয়ালেট ব্যবহার করেন, তারা কিউ.আর কোড সম্পর্কে অবহিত আছেন। বিভিন্ন পেমেন্ট সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজেদের কিউ.আর কোড দোকানে দোকানে বসিয়ে দিয়ে এসেছে। তাই আপনি যখন কোনো একটি স্টোরে পেমেন্ট করতে যান, দেখবেন কাউন্টারে অনেকগুলো কিউ.আর কোড-সংবলিত স্ট্যান্ড দাঁড়িয়ে আছে। আপনার কাছে যদি তাদের অ্যাপটি থাকে, তাহলেই আপনি তাদের কিউ.আর কোড ব্যবহার করে পেমেন্ট করতে পারবেন।


এর ফলে একটি স্টোরে নানান প্রতিষ্ঠানের কিউ.আর রাখতে হচ্ছে। এবং যার যার অ্যাপ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এই বাধা দূর করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী ১ জুলাই থেকে বাংলাদেশের সকল কিউ.আর কোডকে একটি স্ট্যান্ডার্ড কিউ.আর কোডে আনার ঘোষণা দিয়েছে। সেই কিউ.আর কোডের নাম হলো ‘বাংলা কিউ.আর’। আগামী মাস থেকে সব দোকানে এই নতুন কিউ.আর কোড চালু করতে হবে।


ওপরে বিষয়টি যত সহজে বললাম, এটি এত সহজ নয়। এটি একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। এবং এটিকে ভালোভাবে এক্সিকিউট করতে না পারলে ব্যর্থ হওয়ার উচ্চ আশঙ্কা রয়েছে। এখানে এর তিনটি কারণ উল্লেখ করে দিচ্ছি।


কারণ-১: বাড়তি খরচ


বর্তমানে কিউ.আর কোড ব্যবহার করে পেমেন্ট করে থাকে একটু ধনী টাইপের মানুষজন, যার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কার্ড রয়েছে। তাদের ভালো স্মার্টফোন আছে। এবং একটু  উন্নত দোকানগুলোতে এগুলো মোটামুটি চালু আছে। কিন্তু বাংলা কিউ.আর কোড চালু করা হচ্ছে সর্বস্তরে ইলেকট্রনিক পেমেন্ট চালু করার জন্য। অর্থাৎ সমাজের সকল স্তরের মানুষ যেন এটা ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু প্র‌শ্ন হলো, একজন মুদি দোকানি কেন কিউ.আর কোড দিয়ে পেমেন্ট নেবেন? আমরা তাঁর কোন সমস্যাটা সমাধান করছি? সরকার বললেই কি তিনি ওটা ব্যবহার করা শুরু করবেন?
বিগত সরকারের সময় খুব ঘটা করে চালু করা হয়েছিল ‘ক‍্যাশলেস মতিঝিল’–ঠিক বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনেই। কয়েক সপ্তাহ যেতেই সেটিতে ভাটা পড়ে গেল। মুখ থুবড়ে পড়ল পুরো ক্যাশলেস প্রক্রিয়া। ছোট প্রান্তিক দোকানি কেন ডিজিটাল পেমেন্ট নেবেন?


আসলে তিনি এটা নেবেন না। কারণ ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করলে তিনি কম টাকা পান। একটু খুলে বলি। আপনি যদি তাঁকে এক হাজার টাকা পরিশোধ করেন, তাহলে তিনি ৯৯০ টাকা পাবেন (শতকরা ১% সার্ভিস চার্জ)। ক্ষেত্রবিশেষে আরও কম হতে পারে। যে দোকানির এক লাখ টাকা বিক্রি হয়, তাঁকে দিতে হবে এক হাজার টাকা। এটা হলো পেমেন্ট কোম্পানির সার্ভিস চার্জ। আমি একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। আমি কেন এত টাকা দিয়ে এই সেবা নিতে যাব? তার চেয়ে ক্রেতা আমাকে টাকার নোট দিলেই আমি খুশি। টাকার নোট নিতে আমার তো কোনো বাড়তি ফি দিতে হচ্ছে না।
বাড়তি খরচের জন্য বেশির ভাগ দোকানি এটা ব্যবহার করবেন না। তিনি সাইনবোর্ডটা ডেস্কে রাখবেন। কিন্তু ক্যাশ টাকাই নিতে চাইবেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো প্রাইস সেনসেটিভ মার্কেটে বাড়তি ১ শতাংশ কেটে নেওয়া অনেক টাকা। 
ডিজিটাল হলে যদি আমার খরচ বাড়ে, তাহলে আমি সেটি কেন করব?


কারণ-২: ভ্যাট/ ট্যাক্স


বাংলাদেশের সবার ধারণা, সরকার ডিজিটাল করতে চায় তার আয় বাড়ানোর জন্য। যেহেতু ডিজিটাল পেমেন্টে সব কিছু রেকর্ড করা থাকে এবং এর সঙ্গে এনবিআরের লিংক আছে, তাই দোকানি ভাবতে শুরু করবেন, কবে যেন তাঁর ওপর ট্যাক্সের ঝামেলা বসে যায়! ভ্যাট এবং ট্যাক্স এই দুটোই তাঁর ওপর খড়্গের মতো চলে আসার ভয়ে তিনি আতঙ্কিত। সেই দোকানি কখনোই খাল কেটে কুমির আনতে চাইবেন না। নানান অজুহাতে তিনি এটি এড়িয়ে যাবেন।


গ্রাহক চাপ দিলেও তিনি এটি করতে চাইবেন না। কারণ কিউ.আর কোড তাঁর নিজের কোনো সমস্যা সমাধান করে না। দোকানি এখন যেভাবে ব্যবসা চালাচ্ছেন, তিনি এটিকেই আঁকড়ে ধরে রেখে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এর বাইরে তাঁকে নেওয়া অনেক কঠিন হবে। তার ওপর যদি ভ্যাট/ট্যাক্স আরোপ হয়, তাহলে সেটি আগে থেকেই পরিষ্কার করে বলে দিতে হবে যে ওই সাল থেকে তাঁকে এগুলো দিতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ এমনিতেই সরকারকে খুব একটা বিশ্বাস করে না। তার কারণও যথার্থ। সিস্টেম এবং সরকারকে যদি বিশ্বাস অর্জন করতে হয়, তাহলে তাকে স্বচ্ছ হতে হবে।


কারণ-৩: ক্যাশ আউট


বাংলাদেশ এখনও ক্যাশনির্ভর দেশ। ক্যাশ-ইন আর ক্যাশ-আউট যতটা বুঝি, পেমেন্ট ততটা বুঝি না। প্রচলিত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবায় ক্যাশ-আউট করলে হাজারে যত টাকা খরচ হয়, বাংলা কিউ.আর দিয়ে ক্যাশ-আউট করলে, তার থেকে খরচ কম হবে (যদিও এটা বৈধ নয়)। যেহেতু খরচ কম হবে, তাই সবাই এটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। এটি হবে নতুন ক্যাশ-ইন আর ক্যাশ-আউটের মাধ্যম। ট্রানজেকশন অনেক বাড়বে–কিন্তু সেগুলো পেমেন্ট নয়–ক্যাশ-ইন আর ক্যাশ আউট। তাহলে তো আর বিষয়টা পেমেন্ট পদ্ধতি হলো না। ক‍্যাশের ব্যবহার কমানো গেল না।বাংলা কিউ.আর কোড ঝুঁকিতে পড়ার এই তিনটি বড় কারণের বাইরেও আরও অনেক কারণ রয়েছে। তবে সেগুলো পেছনের কাজ। ওগুলো হলো ইকোসিস্টেম তৈরি করা। সেগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তৈরি করা যাবে। কিন্তু বেসিক বিষয়গুলো প্রথম থেকেই হাত না দিলে, ইকোসিস্টেম তৈরি পর্যন্ত আর যাওয়া লাগবে না!


একটি পণ্য বা সেবা তৈরি করা খুব সহজ। সেটিকে মানুষের মাঝে ব্যবহারযোগ্য করে তোলাটাই সবচেয়ে কঠিন এবং ব্যয়সাপেক্ষ কাজ। এই কাজের জন্য সরকার যদি কোনো কম্প্রিহেনসিভ পরিকল্পনা না করে, তাহলে এটি থেকে সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ! 


গুড লাক!

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও