ট্রাম্পের শুল্ক কৌশল ধাক্কা খেলেও বাংলাদেশের ওপর চাপ কমেনি
ট্রাম্প প্রশাসনের জরুরি ভিত্তিতে শুল্ক আরোপের পথটি আদালতে ব্যর্থ হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের ওপর ওয়াশিংটনের চাপ প্রয়োগের কৌশল থেমে নেই; বরং তারা নতুন একটি হাতিয়ার খুঁজে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট যখন ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার্স অ্যাক্টের (আইইইপিএ) আওতায় ট্রাম্পের ব্যাপক শুল্ক আরোপের আইনি ভিত্তিকে দুর্বল করে দেন, তখন ধারণা করা হয়েছিল যে ঢাকা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে। যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট) দ্রুত সম্পাদনের পেছনে যে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপের পর তা অনেকটাই নিষ্প্রভ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে ওয়াশিংটন দ্রুতই সেই সুযোগটুকুও ছিনিয়ে নিতে উদ্যোগী হয়েছে।
এখন যুক্তরাষ্ট্র ধারা ৩০১-এর আশ্রয় নিচ্ছে। জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের অর্থনীতিকে নতুন করে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকির মুখে ফেলা হচ্ছে।
১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ধারা ৩০১ যুক্তরাষ্ট্রকে একতরফাভাবে বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপক ক্ষমতা দিয়ে রেখেছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) কোনো রাষ্ট্রের কার্যক্রম, নীতি বা চর্চাকে ‘অযৌক্তিক’, ‘অন্যায্য’ বা ‘বৈষম্যমূলক’ বিবেচনা করে তদন্ত করতে পারেন এবং সেগুলোকে মার্কিন বাণিজ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করলে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারেন। অতীতে এই বিধান মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন, প্রযুক্তি হস্তান্তর নীতি এবং অন্যায্য প্রতিযোগিতার অভিযোগে ব্যবহার হয়েছে। এখন এটি জোরপূর্বক শ্রমবিরোধী আইন প্রয়োগে ব্যর্থতার অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
তবে সমস্যার মূল রয়েছে এর কাঠামোতেই। বিষয়টি শুধু এই নয় যে ধারা ৩০১ আইইইপিএর চেয়ে শক্তিশালী। বরং শ্রম অধিকারের ভাষ্যকে ভূরাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের একটি যন্ত্রে পরিণত করা হচ্ছে। এখানে জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ নৈতিক যুক্তি সরবরাহ করছে, ধারা ৩০১ সরবরাহ করছে চাপ প্রয়োগের অস্ত্র, আর বাংলাদেশকে আবারও হুমকির মুখে বসে দর-কষাকষি করতে বাধ্য করা হচ্ছে।
আইইইপিএ ছিল সরাসরি, নাটকীয় এবং আইনি দিক থেকে দুর্বল। বিপরীতে ধারা ৩০১ অনেক বেশি পরিকল্পিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কোনো বিদেশি চর্চার তদন্ত করতে পারে, সেটি কীভাবে মার্কিন বাণিজ্যের ক্ষতি করছে তা নির্ধারণ করতে পারে, সংশ্লিষ্ট দেশের প্রতিক্রিয়ার যথার্থতা বিচার করতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। অর্থাৎ অভিযোগকে অর্থনৈতিক চাপে রূপ দেওয়ার আগে কোনো নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনালের অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে না। যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব বাণিজ্য আইনের কাঠামোর মধ্যেই তদন্তকারী, প্রসিকিউটর এবং কার্যকরকারী—তিন ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সময় নির্বাচনকে নিছক কাকতালীয় বলা কঠিন। ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ পর্যায়ে, তৎকালীন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান (বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী) এই পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তিটি উপস্থাপন করা হয়েছিল প্রতিরক্ষামূলক প্রয়োজনীয়তা হিসেবে। বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে বাংলাদেশকে কিছু কঠিন ছাড় মেনে নিতেই হবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বৈদেশিক বাণিজ্য নীতি
- শুল্ক আরোপ