বাজেট বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ

কালের কণ্ঠ নিরঞ্জন রায় প্রকাশিত: ১৮ জুন ২০২৬, ১১:০৭

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়সংবলিত জাতীয় বাজেট পেশ করেছেন। এই বাজেটে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।


ফলে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। সার্বিকভাবে বাজেট ঘাটতি ২৬ শতাংশ, যা জিডিপির ৬.৫ শতাংশ। সংখ্যার বিচারে এবারের বাজেট যে বিশাল আকৃতির, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিশাল আকৃতির বাজেটের কারণে বড় ধরনের ঘাটতি হবে, এটিই স্বাভাবিক।

আমাদের দেশে বিশাল আকৃতির বাজেট প্রণয়ন এবং সেই সঙ্গে বড় ধরনের বাজেট ঘাটতি একেবারেই নতুন কিছু নয়। এই প্রবণতা শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বের উন্নত এবং অনুন্নত সব দেশেই পরিলক্ষিত হয়। তবে আমাদের দেশে বাজেট প্রণয়নের কিছু বিশেষ দিক আছে। প্রতিবছরই একটি নির্দিষ্ট হারে বাজেটের আকার বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।

আগের বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়িত না হওয়া সত্ত্বেও পরবর্তী অর্থবছরের জন্য বিশাল আকৃতির বাজেট প্রণয়ন করা হয়।


বাজেট সাধারণত শতভাগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। কিন্তু বাজেট প্রণয়ন এবং বাজেট বাস্তবায়নের মধ্যে তফাত যত কম হবে, সেই বাজেট তত বেশি অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবে। বাজেটের ক্ষেত্রে একটি কথা প্রচলিত আছে তা হচ্ছে, যে বাজেট বাস্তবায়ন করা যাবে না, সেই বাজেট প্রস্তুত না করাই ভালো। কেননা এই ধরনের বাজেটে কোনো লাভ হয় না।

পক্ষান্তরে বাজেট যদি আকারে ছোটও হয়, কিন্তু যদি দক্ষতার সঙ্গে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তাহলে সেই বাজেটে অর্থনৈতিক উপকারিতা অনেক বেশি। যেমন—১০ লাখ কোটি টাকার বাজেট নিয়ে যদি ৬০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়, তাহলে অর্থনীতিতে ভূমিকা থাকবে ছয় লাখ কোটি টাকার। পক্ষান্তরে আট লাখ কোটি টাকার বাজেট নিয়ে যদি ৯০ শতাংশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তখন দেখা যাবে যে অর্থনীতিতে সাত লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার অবদান থাকবে। বাজেটের সঙ্গে জড়িত এসব কৌশলগত বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বাজেট প্রণয়ন করা হয় কি না, তা আমাদের জানা নেই। তবে এতটুকু বোঝা যায় যে এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে প্রথমেই প্রশ্ন উঠত যে গত বাজেটের বড় একটি অংশ বাস্তবায়িত না হওয়া সত্ত্বেও নতুন বছরের জন্য কেন বিশাল আকৃতির বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে? অবশ্য বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলেও বাজেট প্রণয়নের সময় তা কাজে লাগানোর সুযোগ খুব কম। কেননা আমাদের দেশে বাজেট যত না অর্থনৈতিক, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। 


প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বাজেটে উল্লিখিত ঘাটতি এবং প্রকৃত ঘাটতির মধ্যে একটি পার্থক্য সব সময়ই থাকে। শুধু তা-ই নয়, প্রকৃত ঘাটতি লিখিত ঘাটতির থেকে অনেক বেশি হয়ে থাকে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলে যে বাজেটে ঘোষিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা কখনোই পূরণ করা সম্ভব হয়নি। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এরই মধ্যে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে এক লাখ কোটি টাকার অধিক রাজস্ব কম আদায় হয়েছে। আগামী অর্থবছর যে খুব একটা ভালো হবে, তেমন আশা করা কঠিন। কেননা দেশের অর্থনীতিতে একটা মন্দাভাব বিরাজ করছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে আছে অনেক অনিশ্চয়তা। দেশের ব্যবসায়ীরা এখনো সেভাবে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাতে পারছেন না। আমদানি-রপ্তানি এখনো নিম্নমুখী। কর্মসংস্থান সেভাবে বৃদ্ধি তো পাচ্ছেই না, উল্টো নতুন করে মানুষ বেকার হতে শুরু করেছে। সর্বোপরি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর সার্বিক নেতিবাচক প্রভাব যে সরকারের রাজস্ব আহরণের ওপর পড়বে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এসব কারণে প্রস্তাবিত বাজেটের এক লাখ কোটি টাকা বা তার অধিক রাজস্ব আদায় কম হতে পারে। যদি তেমনটা হয়, তাহলে এই বাজেটে প্রকৃত ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে তিন লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি।


এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাজেটের এই বিশাল ঘাটতির অর্থ সংগ্রহ করা হবে কিভাবে? বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে যে মোট ঘাটতির এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে বৈদেশিক উৎস থেকে। অবশিষ্ট ঘাটতির এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে ব্যাংকঋণ নিয়ে। আর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার কারণে যে ঘাটতি দেখা দেবে, সেই অর্থ কিভাবে সংগ্রহ করা হবে, তার ব্যাখ্যা কখনোই বাজেটে থাকে না, এবারও নেই। এই ঘাটতির অর্থ সংগ্রহের ওপরই নির্ভর করে বাজেট বাস্তবায়ন কতটা সফল হবে।


বিশাল ঘাটতির কারণে বাজেটে দুই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রথম সমস্যা দেখা দেবে যদি ঘাটতির অর্থ সংগ্রহ করা না যায়। সে ক্ষেত্রে বাজেট বাস্তবায়ন সেভাবে হবে না। শুধু সরকারের পরিচালনা ব্যয় মেটানোর মধ্যে বাজেট বাস্তবায়ন সীমিত হয়ে যাবে। আর এই রকমটি ঘটলে বাজেটের যে লক্ষ্য; যেমন—বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অর্থনীতিতে গতি আনা, জিডিপি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি হ্রাস—এর কোনো কিছুই অর্জিত হবে না। দ্বিতীয় সমস্যা দেখা দেবে যখন সরকার যেকোনো প্রকারে ঘাটতির অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেবে। বাজেটে যদিও বৈদেশিক উৎস থেকে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই পরিমাণ অর্থ বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা কঠিন। আবার প্রস্তাবিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা থাকায় সরকারকে অতিরিক্ত ঘাটতির অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। সব মিলিয়ে সরকারকে এই বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে কমপক্ষে দু-তিন লাখ কোটি টাকা বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করতে হবে।


সরকারের যেহেতু ঘাটতির অর্থ সংগ্রহের উৎস খুব বেশি নেই, তাই ব্যাংকই হবে শেষ ভরসা। আর এখানেই আছে মূল সমস্যা। প্রথমত, দেশের ব্যাংকিং খাতের যে অবস্থা, তাতে ব্যাংকগুলোর সরকারকে এই বিশাল অঙ্কের ঋণ প্রদানের সক্ষমতা আছে কি না। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকঋণের ওপর যেহেতু সুদের হার অনেক বেশি, তাই সরকারকে ব্যাংক থেকে গৃহীত ঋণের ওপর উচ্চ হারে সুদ দিতে হবে এবং এর ফলে সরকারের সুদ বাবদ বরাদ্দের পরিমাণ বেড়ে যাবে, যা আগামী বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে সরকারকে ঋণ নিয়ে ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হবে, যা সরকারকে ঋণের দুষ্টচক্রের মধ্যে আটকে ফেলতে পারে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও