পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট ভাঙার উপায় কী
সরকার বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের শীর্ষ পদে পরিবর্তন এনেছে। চেয়ারম্যানসহ যে চারজন নতুন নেতা যোগ দিয়েছেন, তাঁদের চেয়ে ভালো কেউ হতে পারতেন বলে আমার তেমন মনে হয়নি। অর্থমন্ত্রী বাজেটের আগে ও বাজেট উপস্থাপনায়ও পুঁজিবাজার চাঙা করার পরিকল্পনার কথা বলেছেন। কিন্তু এসইসিতে নতুন লোকের যোগ দেওয়া কিংবা অর্থমন্ত্রীর সদিচ্ছাতেই পুঁজিবাজার চাঙা হয়ে যাবে বা বিনিয়োগকারীর স্বার্থ দীর্ঘকালে রক্ষিত হবে ভাবলে বোকামি হবে।
বিশ্বের প্রায় সব সফল শিল্পোন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির অভিজ্ঞতা বলছে, দীর্ঘমেয়াদি শিল্প বিনিয়োগের সবচেয়ে কার্যকর উৎস হলো পুঁজিবাজার। কারণ, শিল্পায়ন স্বভাবতই দীর্ঘমেয়াদি, ঝুঁকিনির্ভর ও ধৈর্যসাপেক্ষ। ব্যাংক খাত, বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি আমানতনির্ভর ব্যাংকিং কাঠামো, শিল্পায়নের এই দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন পুরোপুরি পূরণ করতে পারে না। অথচ বাংলাদেশে শিল্প অর্থায়নের প্রধান উৎস এখনো ব্যাংকঋণ। এই ব্যাংকনির্ভরতা শুধু আর্থিক খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে না, বরং অর্থনীতির কাঠামোগত ভারসাম্যও দুর্বল করছে। এর মূল কারণ পুঁজিবাজারকে কখনোই কৌশলগতভাবে শিল্পায়নের অর্থায়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ধারাবাহিক রাজনৈতিক ও নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান দুর্বলতার সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রতীক হলো ২০২৫ সালে বছরজুড়ে একটি নতুন আইপিওও না আসা। এটি নিছক বাজার মন্দা নয়; বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকেত। আইপিও মানে শুধু নতুন শেয়ার নয়, এর অর্থ নতুন উদ্যোক্তা, নতুন শিল্প, নতুন কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ। যখন একটি অর্থনীতিতে দীর্ঘ সময় নতুন আইপিও বন্ধ থাকে, তখন সেটি বোঝায় উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজারকে আর কার্যকর মূলধন সংগ্রহের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করছেন না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্প সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের ওপর। অর্থাৎ আইপিও–সংকট আসলে বৃহত্তর অর্থনৈতিক গতিশীলতার সংকট।
বর্তমান সরকার অতীতের অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা, শেয়ারবাজার কারসাজি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অপব্যবহারকে উদ্যোক্তাদের আস্থাহীনতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছে। এ ব্যাখ্যায় সত্যতা আছে, কিন্তু বাস্তবতা আরও গভীর। কারণ, আস্থাহীনতার শিকড় শুধু অতীতের কারসাজিতে নয়; বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ব্যর্থতায়।
বাজারে মানসম্মত, বড় ও সুশাসিত কোম্পানির ঘাটতি, জটিল ও ব্যয়বহুল আইপিও প্রক্রিয়া, নীতিমালার ঘন ঘন পরিবর্তন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ধারাবাহিকতার অভাব, সব মিলিয়ে পুঁজিবাজারকে উদ্যোক্তাদের জন্য অনিশ্চিত করে তুলেছে। একজন ভালো উদ্যোক্তা যদি নিশ্চিত না হন যে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর তিনি পূর্বানুমেয় নীতি, ন্যায্য মূল্যায়ন ও স্থিতিশীল বাজার পাবেন, তাহলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকঋণ, প্রাইভেট ইকুইটি বা বিকল্প অর্থায়নের দিকে ঝুঁকবেন।
এখানেই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সংকট—বিনিয়োগযোগ্য মানসম্মত ইকুইটির ঘাটতি। একটি বাজারের গভীরতা নির্ভর করে তার তালিকাভুক্ত কোম্পানির গুণগত মান, আকার ও বৈচিত্র্যের ওপর। বাংলাদেশে বড় মূলধনের, উচ্চ সুশাসনসম্পন্ন, শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তির কোম্পানির সংখ্যা সীমিত। ফলে বাজার কয়েকটি নির্দিষ্ট শেয়ারের মধ্যে আবর্তিত হয়, যা অস্বাভাবিক মূল্য ওঠানামা, জল্পনা ও কারসাজির ঝুঁকি বাড়ায়। আমরা প্রায়ই সার্কিট ব্রেকার, মার্জিন ঋণ, টিকিট সাইজ বা লেনদেন নীতির মতো কারিগরি সংস্কার নিয়ে আলোচনা করি, কিন্তু এগুলো মূল সমস্যার প্রান্ত ছোঁয় মাত্র। প্রকৃত প্রশ্ন হলো বাজারে নতুন, বড়, লাভজনক ও বিশ্বাসযোগ্য কোম্পানি কোথায়? আবার তাদের আনতে গেলে যে অভিনব কৌশল দরকার, তারও অভাব রয়েছে।
এই বাস্তবতায় লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত গেম চেঞ্জার হতে পারে। রাষ্ট্রায়ত্ত বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকাভুক্তি বাজারে গভীরতা বাড়াবে, বিনিয়োগযোগ্য মানসম্মত ইকুইটির ঘাটতি কমাবে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ফিরিয়ে আনবে এবং বাজারে আস্থার নতুন ভিত্তি তৈরি করবে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানে করপোরেট গভর্ন্যান্স, আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে। সরকারের জন্যও এটি ব্যাংকঋণ বা বাজেট চাপের বাইরে বাজারভিত্তিক মূলধন সংগ্রহের টেকসই পথ হতে পারে। অন্যদিকে ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে আনার জন্য তাদের ইকুইটির ওপর ভিত্তি করে সর্বোচ্চ ঋণসীমা ঠিক করে দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে হবে।