দুয়ারে ডেঙ্গু মৌসুম, গতানুগতিক কার্যক্রমে আটকা মশক নিধন
দেশে বর্ষাকাল সমাগত। আর বর্ষা মানেই ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস মশার বংশবিস্তারের আদর্শ সময়। এই মৌসুমে এডিস মশার বিস্তারের জন্য চারপাশের পরিবেশ পুরোপুরি অনুকূলে থাকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতেও ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন কেবল গতানুগতিক ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ আর লোকদেখানো জনসচেতনতা তৈরির চেষ্টা ছাড়া বড় কোনো সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। ফলে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এবারের ডেঙ্গু মোকাবিলা করা মোটেও সহজ হবে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই প্রায় ৪ হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে কেবল শেষ ১০ দিনেই প্রায় ৭ শ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি মৌসুম যেহেতু এডিস মশার বংশবিস্তারের উপযুক্ত সময়, তাই এর প্রকোপ আরও মারাত্মক হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) সাম্প্রতিক এক জরিপে উদ্বেগের চিত্র পেয়েছে। সংস্থাটির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টি ওয়ার্ডেই এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত সূচকের চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৮টি ওয়ার্ডকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ডিএসসিসির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার ৩৬ জন কর্মীর মাধ্যমে আধুনিক ‘কবো টুলবক্স’ প্রযুক্তির সাহায্যে এই জরিপ পরিচালিত হয়।
জরিপকালে ২,২৫০টি বাড়ি থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়, যার মধ্যে ২৮১টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে বহুতল ভবনে সর্বোচ্চ ৩৫.২৩%, স্বতন্ত্র বা একক বাড়িতে ২৭.৭৬%, নির্মাণাধীন ভবনে ১৭.৪৪% এবং সেমিপাকা বাড়িতে ১৪.৫৯% লার্ভা পাওয়া গেছে। এছাড়াও মেঝের জমে থাকা পানিতে ১২.২৬%, বালতিতে ১০.৩৪% এবং প্লাস্টিকের ড্রামে ৮.৮৯% প্রজননক্ষেত্রের উপস্থিতি মিলেছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নিজেদের উদ্যোগে এই জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করলেও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এখন পর্যন্ত এমন কোনো জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করেনি।
ঢাকায় মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। দুই সিটি কর্পোরেশনের বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বিগত ১০ বছরে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করেছে ৬৮৮.৩৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ব্যয় করেছে ৩২৩.৬৩ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৮৭.৭৫ কোটি টাকা এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ৫৩.৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে।
এত বিপুল অর্থ ব্যয়, নানা কর্মসূচি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সত্ত্বেও বছরজুড়ে মশার উৎপাত নিয়ন্ত্রণে আসেনি। মশা মারতে বিভিন্ন সময়ে অদ্ভুত সব থেরাপি ব্যবহার করা হয়েছে। মশা শনাক্ত করতে ড্রোন ওড়ানো হয়েছে। জলাশয়ে ছাড়া হয়েছে ব্যাঙ, হাঁস, তেলাপিয়া ও গাপ্পি মাছ। কিন্তু ড্রোনের ওড়াউড়ি বা ব্যাঙের ডাক— কোনো কিছুতেই ঢাকার মশার বংশবিস্তার ঠেকাতে পারেনি।
রাজধানীর বাসাবো এলাকার বাসিন্দা খোরশেদ আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দিনদিন ঢাকায় ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে। কিন্তু মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি কর্পোরেশনের লোকজনকে নিয়মিত দেখা যায় না। মাঝে মাঝে তারা এলাকায় এসে ওষুধ স্প্রে করলেও তা নিয়মিত নয়। আমাদের পরিচিত অনেকেই ইতোমধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। আমরা আমাদের বাড়িঘর পরিষ্কার রাখছি, কিন্তু সিটি কর্পোরেশনের কার্যকর পদক্ষেপ চোখেই পড়ছে না।
একই ধরনের অভিযোগ জানিয়ে বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা সজিবুর রহমান বলেন, ‘সামনে ডেঙ্গুর ভরা মৌসুম, অথচ মশা নিয়ন্ত্রণের কোনো লক্ষণ নেই। আগে তাও মাঝে মাঝে মশা মারার স্প্রে বা ধোঁয়া (ফগিং) উড়াতে দেখা যেত, এখন তাও দেখা যায় না। তারা আসেই না। এভাবে চলতে থাকলে পরিস্থিতি মহামারি আকার ধারণ করবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের স্বাভাবিক নিয়মিত কার্যক্রমগুলো চলমান আছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা, জমে থাকা পানি অপসারণ, মশার ওষুধ ছিটানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ অভিযান চলছে। তবে, ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হওয়ার আগে প্রতিটি ওয়ার্ডে বড় পরিসরে ম্যাসিভ কর্মসূচি চালানো উচিত ছিল। আমাদের জনবল কম, তারপরও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।
একইভাবে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের আরেক কর্মকর্তা বলেন, পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা অভিযান ধারাবাহিকভাবে সব ওয়ার্ডেই চলছে। তবে, আসন্ন ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রতিটি ওয়ার্ডে যে বিশাল পরিসরে কার্যক্রম চালানো দরকার, জনবল সংকটের কারণে সেভাবে করা সম্ভব হচ্ছে না।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করেছে ৬৮৮.৩৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ব্যয় করেছে ৩২৩.৬৩ কোটি টাকা।