সমীকরণ বদলাবে কি আঞ্চলিক সম্পর্কের
ভারত-মিয়ানমার সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই কৌশলগত এবং দৃশ্যত উষ্ণ। ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে সরকারি পর্যায়ে অন্তত ৯টি উচ্চপর্যায়ের সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সফরে স্বাক্ষরিত হয়েছে অসংখ্য চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক। ভৌগোলিক কারণেই এই সম্পর্কের গুরুত্ব অনেক বেশি। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কয়েকটি রাজ্যের সঙ্গে মিয়ানমারের ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এসব সীমান্ত যেমন বাণিজ্য ও যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি বিদ্রোহী তৎপরতা, মাদক পাচার, অবৈধ অভিবাসন এবং সীমান্ত নিরাপত্তার মতো জটিল চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের সাম্প্রতিক ভারত সফর বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
প্রকৃতপক্ষে মিন অং হ্লাইংয়ের প্রথম বিদেশ সফর চীনে হওয়ার কথা ছিল। তবে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের আন্তর্জাতিক ব্যস্ততা এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে তিনি ভারতকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেন। প্রতীকী দিক থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর মাধ্যমে মিন অং হ্লাইং দেখাতে চেয়েছেন যে তিনি শুধু বেইজিংয়ের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল নন।
যদিও মিয়ানমারের ওপর চীনের প্রভাব কমানো সহজ কোনো বিষয় নয়। মিয়ানমারের জান্তা সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপরও চীনের প্রভাব রয়েছে। দেশটির অবকাঠামো, জ্বালানি ও বিরল খনিজ খাতে চীনের বিপুল বিনিয়োগও রয়েছে। ফলে ভারত সফর করলেই যে চীনের প্রভাব কমে যাবে, বিষয়টি এত সরল নয়। তবে নেপিডো যে বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমাতে চায়, এই সফর তারই ইঙ্গিত দেয়।
পাঁচ দিনের সফরে মিন অং হ্লাইং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে বাণিজ্য, যোগাযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ভারতের জন্য এসব বিষয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দিল্লি দীর্ঘদিন ধরে তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কয়েকটি রাজ্যে নিরাপত্তা এবং সীমান্ত স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
এখানে কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট (কেএমএমটি) প্রকল্পের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মিয়ানমারের চিন রাজ্যের পালেতওয়া থেকে ভারতের মিজোরাম সীমান্তের জোরিনপুঁই পর্যন্ত ১০৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডর ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে মিয়ানমার সেনাবাহিনী, আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন প্রতিরোধ গোষ্ঠীর সংঘর্ষের কারণে প্রকল্পটি বছরের পর বছর ধরে স্থবির হয়ে আছে। ভারত যদি এই করিডরকে কার্যকর করতে চায়, তাহলে প্রকল্প-সংলগ্ন এলাকায় আরও বেশি স্থিতিশীলতা এবং জান্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন হবে।
মিয়ানমারের কাছে ভারতের আরেকটি চাওয়া হতে পারে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) করিডর। এটি ২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডর, যা দেশগুলোর মধ্যে সড়ক, রেল, জল ও বিমান সংযোগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাবে। করিডরটি কলকাতা থেকে শুরু হয়ে ঢাকা, শিলচর, ইম্ফল, মান্দালয়, টেংচং ও চীনের কুনমিং পর্যন্ত যাবে। এর মূল লক্ষ্য হলো বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সংযোগ বাড়ানো।
মিয়ানমার এই করিডরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি ভারতের পূর্ব অঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগস্থল। ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর সঙ্গে মিয়ানমারের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ফলে এই করিডর কৌশলগত সুযোগ তৈরি করবে। করিডরটি মিয়ানমারের মান্দালয়, টেংচং এবং ভারতের মণিপুর ও মিজোরামের সঙ্গে সংযুক্ত।
তবে এই করিডর বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে করিডরটি প্রস্তাব করে, কিন্তু ভারত তা বর্জন করে। কারণ, তারা এটিকে সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি মনে করে। ২০১৫ সাল থেকে করিডরের বাস্তবায়ন স্থগিত আছে। চীন-মিয়ানমার সম্পর্ক এবং ভারত-চীন প্রতিযোগিতাও বড় চ্যালেঞ্জ। চীন মিয়ানমারের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক
ও রাজনৈতিক মিত্র, যা ভারতের জন্য চিন্তার কারণ। এ ছাড়া, ঢাকা-দিল্লির বর্তমান সম্পর্কের দিক থেকে দেখলেও বোঝা যাবে, তা শুধু মিয়ানমারকে নিয়ে এই করিডর বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
তবে শুধু স্থলপথ নয়, সামুদ্রিক ক্ষেত্রেও মিয়ানমারের গুরুত্ব বাড়ছে। বঙ্গোপসাগরে ভারতের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করা এবং চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি মোকাবিলায় দিল্লির কাছে মিয়ানমার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ফলে ভারতের নীতিনির্ধারকেরা ধীরে ধীরে মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে একধরনের ‘ফাংশনাল এনগেজমেন্ট’ বা বাস্তববাদী যোগাযোগের পথে এগোচ্ছেন। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অনেকে এখন জান্তা সরকারকে অনিবার্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক
- ভারত-মিয়ানমার