উচ্চশিক্ষায় পাবলিক-প্রাইভেট সহযোগিতা
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে আলোচনা হলেই আমরা প্রায়ই ভুল পথে হাঁটি। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার কথা ছিল গবেষণার মান, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আমাদের অবস্থান, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই আলোচনা প্রায়ই গিয়ে দাঁড়ায় পাবলিক বনাম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্কে।
প্রশ্ন হলো, আমরা কার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছি? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা দেশের শীর্ষ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী? নাকি তাদের প্রকৃত প্রতিযোগিতা বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে? যদি আমাদের লক্ষ্য বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে নিজেদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়, বরং সম্মিলিত উন্নয়নের পথ খুঁজতে হবে।
গবেষণা ব্যবস্থার মূল সংকট : বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো গবেষণা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পার হলেও আমরা এখনো একটি শক্তিশালী জাতীয় গবেষণা ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারিনি। উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, গবেষণা শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয় নয়; এটি পুরো জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অংশ। একটি বিশ্ববিদ্যালয় যদি কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে একটি অত্যাধুনিক NMR, Mass Spectrometer বা Electron Microscope কিনে, তাহলে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরাও নির্ধারিত ফি দিয়ে সেটি ব্যবহার করতে পারেন। এতে জাতীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয়। বাংলাদেশে এমন আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সহযোগিতা এখনো খুব সীমিত।
অন্যদিকে উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিল্পখাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। বড় বড় কোম্পানি গবেষণায় অর্থায়ন করে, শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ দেয়, যৌথ প্রকল্প পরিচালনা করে এবং স্নাতকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। ফলে গবেষণার ফলাফল সরাসরি অর্থনীতি ও শিল্পে প্রভাব ফেলে। আমাদের দেশে এ সংযোগ এখনো দুর্বল।
পাবলিক ও প্রাইভেট : উভয়েরই বাস্তবতা আছে : পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ঐতিহাসিক অবদান, গবেষণা সক্ষমতা এবং জাতীয় পরিচয়ে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। একইভাবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও গত তিন দশকে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। বর্তমানে দেশে ১১০-এর বেশি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। হাজার হাজার শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী সরাসরি কর্মরত আছেন। এ ছাড়া বাসস্থান, পরিবহণ, প্রকাশনা, প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, খাদ্যসেবা এবং বিভিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে আরও অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারের জন্য কর ও ভ্যাটের মাধ্যমে রাজস্বও প্রদান করে। পাশাপাশি বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের বহির্গমন আংশিকভাবে কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়েও ভূমিকা রাখে। তবুও গবেষণা অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট বৈষম্য বিদ্যমান। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার জন্য সরাসরি সরকারি বরাদ্দ পায়, যা যৌক্তিক; কিন্তু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য কার্যকর জাতীয় গবেষণা তহবিল, প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অনুদান বা যৌথ গবেষণা স্কিম খুবই সীমিত। ফলে বেশিরভাগ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির ওপর নির্ভর করেই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়।
ট্রাইবাল মানসিকতা থেকে বের হতে হবে : একটি সুস্থ উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় ভালো কাজের স্বীকৃতি দিতে হয়। কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ভালো গবেষণা করলে তার প্রশংসা করতে হবে। একইভাবে কোনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, প্রকাশনা বা উদ্ভাবনে এগিয়ে গেলে সেটিও উদারভাবে স্বীকার করতে হবে। ‘আমরা ভালো, তারা খারাপ’ ধরনের মানসিকতা জ্ঞানচর্চার পরিপন্থি। বিশ্ববিদ্যালয় মানে মুক্ত চিন্তা, সহযোগিতা এবং জ্ঞান বিনিময়। সেখানে দলীয়, গোষ্ঠীগত বা প্রাতিষ্ঠানিক অহংকার উন্নয়নের পথ রুদ্ধ করে।