হাওরে কৃষির সংকট: আধুনিকতার কাছে প্রকৃতির পরাজয়
সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের নিশ্চিন্তপুর গ্রামের কৃষক আবুল কাশেম। প্রতিবছরই হাওরের নিচু জমিতে 'লাখাইয়া' ও 'জগলি' নামের দেশি বোরো ধানের চাষ করেন। তার ভাষায়, “আমার ২৫ কিয়ার জমি একেবারে হাওরের তলানিতে। ওই জমিতে প্রতিবছর দেশি জাতের ধান লাগাই। বছর শেষে ২৫০ থেকে ৩০০ মণ ধান পাই।”
তিনি জানান, এই নিচু জমিতে ধান চাষ মানেই ‘গুছি আর কাঁচি’। মৌসুমের শুরুতে সামান্য হালচাষ করে চারা রোপণ করা আর ধান পাকলে কেটে বাড়ি নিয়ে আসা। মাঝখানে কেবল একবার নিড়ানি দিতে হয়। কোনো সেচ, সার কিংবা কীটনাশকের প্রয়োজনই পড়ে না। এই ধান তিনি বাজারে বিক্রি করেন না, রেখে দেন পরিবারের সারা বছরের খোরাকি হিসেবে। পরিবারের সবাই এই সুগন্ধি চালের ভাত পছন্দ করে। বিষমুক্ত হওয়ায় সেই খাদ্য নিরাপদও।
অথচ অন্য জমিতে যখন তিনি উচ্চফলনশীল 'ব্রি' ধানের চাষ করতে গেলেন, তখন অভিজ্ঞতা হলো সম্পূর্ণ উল্টো। এবার শালদিঘা হাওরে তার অধিকাংশ আধুনিক জাতের ধান জলাবদ্ধতায় পচে নষ্ট হয়েছে। অথচ ওই জমিতে সার, বীজ আর কীটনাশকে প্রচুর টাকা খরচ করেছিলেন। হতাশ কণ্ঠে আবুল কাশেম বলেন, “দেশি ধানই আমাকে বাঁচিয়ে রাখছে। অধিক লাভের আশায় আধুনিক ধানের চাষ এখন উল্টো ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
এই বক্তব্য শুধু একজন কৃষকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, বরং পুরো হাওরাঞ্চলের কৃষি বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। প্রতিবছর আগাম বন্যা, জলাবদ্ধতা, শিলাবৃষ্টি আর খরার ঝুঁকিতে উচ্চফলনশীল ধানের আবাদ এখন চরম অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। দিন দিন উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কিন্তু কৃষকের পকেটে লাভ ঢুকছে না; বরং লোকসানের অঙ্কটাই কেবল বড় হচ্ছে।
কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) কৃষকদের 'ব্রি-৮৮' জাতের বীজ সরবরাহ করলেও, এবার অভিযোগ উঠেছে তার বদলে হাইব্রিড বীজ বিতরণের। কৃষকদের দাবি, এই ধান পাকতে স্বাভাবিকের চেয়ে ২৩ থেকে ২৫ দিন বেশি সময় লেগেছে। আর এই বাড়তি সময়ের মাঝেই ঘটে গেছে বিপর্যয়—মার্চের শুরুতে অতিবৃষ্টির জলাবদ্ধতা এবং এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বিস্তীর্ণ হাওর তলিয়ে যায়। ফলে চোখের পলকে কৃষকের ফসল নষ্ট হয়ে যায়।
গত এপ্রিলের শেষদিকে এই অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাওরাঞ্চল ব্যাপকভাবে প্লাবিত হয়। কোথাও ধান কাটার সুযোগই মেলেনি, আবার কোথাও কেটে রাখা ধান পানিতে ভেসে গেছে। সরকারি হিসাবে প্রায় ৫০ হাজার ৭৩ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, বেসরকারি মতে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ ৮০ হাজার হেক্টরেরও বেশি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাবে এই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ১১০ কোটি টাকা।
কিন্তু এই বিপর্যয়ের অভিঘাত শুধু আর্থিক নয়। একটি ফসল নষ্ট হওয়া মানে বহু পরিবারের জন্য পুরো বছরের খাদ্য, বীজ, গবাদিপশুর খাদ্য এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলা।
বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল একসময় প্রকৃতি, কৃষি আর প্রাণবৈচিত্র্যের স্বতঃস্ফূর্ত সহাবস্থানের উদাহরণ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে হাওরের কৃষি যে গভীর সংকটে পড়েছে, তার বড় অংশই মনুষ্যসৃষ্ট। আধুনিক কৃষির নামে আমরা যে নীতি, প্রযুক্তি আর কৃত্রিম ব্যবস্থাপনা চাপিয়ে দিয়েছি, তাতেই হাওরের কৃষি আজ খাদের কিনারায়।
আধুনিক জাতের ধান নিয়ে কৃষকদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো, হঠাৎ বন্যা বা জলাবদ্ধতায় এসব বেঁটে জাতের ধান সহজেই তলিয়ে যায়। ফলে বাঁধের ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাঁধ ব্যবস্থাপনাও ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় কৃষক বারবার ক্ষতির মুখে পড়ছেন। অথচ দেশি ধানের ক্ষেত্রে এ সমস্যা কখনও এত প্রকট ছিল না।
কৃষি মন্ত্রণালয় অবশ্য চেষ্টা করছে এমন কিছু আগাম জাতের ধান উদ্ভাবন করতে, যা এপ্রিলের ১০-১২ তারিখের মধ্যেই কেটে ফেলা যায়। কিন্তু প্রকৃতি তো মানুষের নিয়ম মেনে চলে না; এখন দেখা যাচ্ছে মার্চের শেষ দিক থেকেই হাওরে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, আর কত আগাম জাত আমরা বানাব? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া এই বোরো চাষ পদ্ধতি আদৌ কি হাওরের প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খায়?
পরিসংখ্যান বলছে, হাওর অধ্যুষিত সাতটি জেলায় আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ১২ লক্ষ ছয় হাজার হেক্টর, যার ৬৬ শতাংশই হাওর এলাকার মধ্যে।
একসময় কৃষকরা হাওরের প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কৃষিকাজ করতেন। লক্ষ্য ছিল শুধু মানুষের খাদ্য নয়, পশুখাদ্যেরও নিশ্চয়তা। তাই তারা বামন বা বেঁটে ধানের জাত পছন্দ করতেন না। কারণ গবাদিপশুর জন্য প্রয়োজন ছিল লম্বা দেশি ধানের খড়।
দেশি ধানের গাছ ছিল ৩ থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা। পানিতে ডুবে গেলেও অনেক সময় ওই ধানের তেমন ক্ষতি হতো না। ধানক্ষেত হয়ে উঠত মাছ, ব্যাঙ, কাঁকড়া ও নানা প্রাণীর আবাসস্থল। ধান পেকে গেলে মাঠ ভরে যেত পাখিতে। ধানের খড় ছিল গরু-ছাগলের খাদ্য, ভূষি ছিল হাঁস-মুরগি ও মাছের খাবার।
কিন্তু অধিক ফলনের লোভ দেখিয়ে হাওরে উফশি ও হাইব্রিড ধানের আগ্রাসন ঘটানো হলো। ফলে পরিবেশবান্ধব দেশি ধানগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল। এর হাত ধরে কমে গেল গবাদিপশু, হাঁস এবং পরিযায়ী পাখির সংখ্যাও। আগে ধান চাষের মৌসুমের সঙ্গে মিলিয়ে যেভাবে হাজার হাজার হাঁস পালন করা যেত, ওই চেনা রূপটিও আজ বিলীন।
বর্তমানে দেশে আধুনিক জাতের ধানের উৎপাদন বাড়াতে বছরে প্রায় ৬৯ লাখ টন রাসায়নিক সার ও ৪০ হাজার মেট্রিক টন বালাইনাশক (কীটনাশক) ব্যবহার করা হচ্ছে। আবাদকৃত ৫৭.৬৯ লক্ষ হেক্টর জমির ৭২.০৭ শতাংশে ভূগর্ভস্থ পানি সেচ দিতে হচ্ছে। এর ফলে মাটি, পানি ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হচ্ছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- হাওরাঞ্চল
- ফসলের ক্ষতি