ট্রিলিয়ন ডলারের স্টার্টআপ এবং আমাদের এআই ভবিষ্যৎ
গত ২৮ মে ছিল ঈদুল আজহা। সেদিন সকাল থেকে আমরা ব্যস্ত ছিলাম ঈদের নামাজ, কোরবানি, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা, মাংস ভাগাভাগি করা আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো নিয়ে। ঈদের ছুটির রেশ এখনো আছে। আমাদের এমন ব্যস্ততার মধ্যেই পৃথিবীর অন্য প্রান্তে একটি ঘটনা ঘটেছে, যা আগামী দশকের অর্থনীতি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নেবে বলে মনে হচ্ছে।
একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) স্টার্টআপের মূল্যায়ন প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। হ্যাঁ, এক ট্রিলিয়ন ডলার এবং এটি এখনো একটি স্টার্টআপ।
এক ট্রিলিয়ন ডলার কত টাকা, সেটা একটু চিন্তা করা যেতে পারে। গেল বছর বাংলাদেশের পুরো অর্থনীতির আকার ছিল ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। অর্থাৎ একটি মাত্র কোম্পানির মূল্যায়ন আমাদের পুরো দেশের বার্ষিক অর্থনৈতিক উৎপাদনের দ্বিগুণের বেশি।
এই এআই কোম্পানির নাম এনথ্রোপিক। ঈদের ছুটিতে ৯৬৫ বিলিয়ন ডলার তথা ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি মূল্যায়নে এটি নতুন বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে ৬৫ বিলিয়ন ডলার।
মাত্র পাঁচ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এ কোম্পানি এখন পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে দামি স্টার্টআপ। এর আগে জনপ্রিয় এআই চ্যাটবট ওপেনএআইয়ের মূল্যায়ন হয়েছিল ৮৫২ বিলিয়ন ডলার। খোঁজ নিয়ে দেখলাম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রধান ১০টি কোম্পানির মোট মূল্যায়ন এখন ২.৫ থেকে ৩.০ ট্রিলিয়ন ডলার, যা কিনা বাংলাদেশের জিডিপির ৬ গুণের চেয়ে বেশি।
প্রশ্ন হলো, এ কোম্পানি কী বিক্রি করে? তেল নয়। গ্যাস নয়। গাড়ি নয়। এমনকি মুঠোফোনও নয়। তারা তৈরি করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল এবং সেটি ব্যবহার করার অ্যাপ্লিকেশন!
একটি প্রশ্ন থেকে শুরু
২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর চ্যাটজিপিটি উন্মুক্ত হওয়ার পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। তবে তারও আগে ওপেনএআই ও ডিপ মাইন্ড এই ক্ষেত্রের দুই শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ছিল।
২০২১ সালে ওপেনএআইয়ের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ গবেষক প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ভাই-বোন ডারিও অ্যামোডেই ও ড্যানিয়েলা অ্যামোডেই। ডারিও সে সময় ওপেনএআইয়ের গবেষণা বিভাগের অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তি ছিলেন। তাঁরা দুজন ও তাঁদের আরও কয়েকজন সহকর্মীর উদ্বেগের বিষয় ছিল, যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে মানুষের মতো কিংবা মানুষের চেয়ে বেশি সক্ষম হয়ে ওঠে, তাহলে সেটিকে কীভাবে নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য এবং মানুষের উপকারে ব্যবহারযোগ্য রাখা যাবে?
এ চিন্তা থেকেই এনথ্রোপিকের জন্ম। ২০২১ সালে তারা প্রথম ১২৪ মিলিয়ন ডলার তহবিল সংগ্রহ করে। ২০২২ সালের গ্রীষ্মে তারা তাদের এআই মডেল ক্লড-এর প্রথম সংস্করণ তৈরি করে। কিন্তু তারা সেটি সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ করেনি। আরও নিরাপত্তা পরীক্ষা চালানো এবং প্রযুক্তি দুনিয়ায় যেখানে ‘আগে বাজারে যাও’ প্রায় অলিখিত নিয়ম, সেখানে এনথ্রোপিক ‘আরও দেখা’র পথ বেছে নেয়। প্রায় আট মাস পরে, ২০২৩ সালের মার্চে ক্লড সবার জন্য উন্মুক্ত হয়। তাদের বিশ্বাস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শুধু আরও শক্তিশালী করলেই হবে না; সেটিকে দায়িত্বশীলও হতে হবে।
ধীরে ধীরে এটি বিশেষ করে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও কোডিংয়ের জগতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অ্যামাজন ও গুগলের মতো প্রতিষ্ঠান এনথ্রোপিকে বিপুল বিনিয়োগ করতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত এবারের ঈদের ছুটিতে কোম্পানিটির মূল্য এক ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। কিন্তু এ লেখার আসল বিষয় এনথ্রোপিক নয়। আসল বিষয় হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারীরা কেন এমন একটি কোম্পানির ওপর এত বড় বাজি ধরছে।