সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা: আমাদের মনের স্বাস্থ্য কেমন আছে
দীর্ঘসময় ধরে সামাজিক অস্থিরতা থাকলে সমাজে যে সমষ্টিগত মানসিক আঘাত তৈরি হয়, তাতে পুরো সমাজের মানসিক পরিবেশ বদলে যেতে বাধ্য। এই সমষ্টিগত মানসিক আঘাত হলো এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে প্রাকৃতিক বা মনুষ্যসৃষ্ট বড় ধরনের বিপর্যয়, বা অন্যায়-অবিচারের ফলে একটি জাতি ও সমাজ আঘাত পায়, ভয় পায় এবং দুর্বল হয়ে পড়ে। এটি কোনো ব্যক্তির একার সমস্যা নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সব মানুষ একই সঙ্গে আতঙ্ক, ভয়, দুঃখ ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। যেমনটা ঘটছে আমাদের ক্ষেত্রে।
দেশে প্রতিদিন এমন সব নৃশংস ঘটনা ও দুর্ঘটনা ঘটছে, যা আমাদের কল্পনারও বাইরে ছিল; অথচ এখন তা স্বাভাবিকের চেয়েও স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। পত্রিকা না পড়ে, খবর না দেখে, সামাজিক মাধ্যমে চোখ না রাখলেও এই সমাজে বসবাসের কারণে কোনোভাবেই রামিসার নৃশংস মৃত্যু, আবদুল্লাহকে বলাৎকারের পর ঝুলিয়ে রাখার খবর, প্রতিদিন হামে ১০–১৫ জন শিশুর মৃত্যু এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
খারাপ খবর পেতে পেতে খারাপেই অভ্যস্ত হয়ে উঠছে আমাদের মন। ধীরে ধীরে কি একধরনের অভ্যস্ততাও তৈরি হচ্ছে নিজেদের অজান্তে? তা না হলে অপরাধের খবরগুলোই সবচেয়ে বেশি পড়ছে কেন মানুষ? খুন, মরদেহ টুকরো করা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যার মতো ভয়ংকর অপরাধগুলো কি ক্রমশ সয়ে যাচ্ছে?
মনোবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, চলমান অপরাধ আমাদের মধ্যে একধরনের নেতিবাচক সহ্যক্ষমতা তৈরি করেছে, যার প্রভাব খুবই খারাপ। অপরাধপ্রবণতায় যে অতিরিক্ত হিংস্রতা যুক্ত হয়েছে, তাতে অপরাধীদের আচরণে মানসিক বিকৃতির লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। হিংস্রতাপূর্ণ অপরাধ বারবার ঘটার কারণে সামাজিক সংবেদনশীলতা কমে যাচ্ছে, সমাজ নির্বিকার হয়ে পড়ছে এবং ব্যক্তির মধ্যে স্বার্থপরতা বাড়ছে। ব্যক্তি শুধুই নিজের ও স্বজনের নিরাপত্তার কথা ভাবছে, যা কোনোভাবেই সুস্থ, স্বাভাবিক সমাজের লক্ষণ নয়।
এর মানে হচ্ছে, আমরা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। ভালো থাকার কথা বলছি, সুস্থ থাকার কথা বলছি; কিন্তু আমরা আসলে ভালো নেই। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক চাপ, অত্যাচার, নিপীড়ণ, অন্যায়, অবিচার ও দুর্নীতি সহ্য করতে করতে আমাদের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, তখনও আমরা বুঝি না যে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য হুমকির মুখে।
কারণ এই সমাজের অধিকাংশ মানুষ ‘মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা’ বলতে ‘পাগল’ হওয়া বোঝে। আর যেহেতু পাগল হওয়া ও পাগলের চিকিৎসা খুবই লজ্জাজনক বলে মনে করা হয়, তাই এটা নিয়ে কথা বলা ও চিকিৎসকের কাছে গিয়ে সহায়তা নেওয়ার মতো মানুষের সংখ্যাও খুব কম। বাংলাদেশে অধিকাংশ রোগী এবং তাদের আশপাশের মানুষ বিশ্বাস করেন, ‘মানসিক রোগ’ বলে কিছু নেই।
অথচ খুব সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বিশ্বে ২০২৩ সালে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিলেন। ১৯৯০ সালের তুলনায় এ সংখ্যা বেড়েছে ৯৫ দশমিক ৫ শতাংশ। সিএনএন জানিয়েছে, চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, উদ্বেগ ও বিষণ্নতার হার সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তিত্বজনিত মানসিক সমস্যা। গবেষকদের ভাষ্য, বিশ্বজুড়ে মানসিক সমস্যার বোঝা আরও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে।