পাংশায় পদ্মা ব্যারাজ : সম্ভাবনা, ঝুঁকি ও অতীতের শিক্ষা

কালের কণ্ঠ জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস প্রকাশিত: ২৬ মে ২০২৬, ০৯:৫২

রাজবাড়ীর পাংশায় পদ্মা নদীতে প্রস্তাবিত ব্যারাজ প্রকল্পটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি বড় উদ্যোগ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এখানে প্রায় ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল ব্যারাজ নির্মাণের কথা রয়েছে।

এতে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস, ফিশ পাস, নৌ চলাচলের সুবিধা এবং পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রায় দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের এই পরিকল্পনা যথাযথ বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, সঠিক নকশা, বাস্তবসম্মত ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের ভিত্তিতে বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী, কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।


প্রকল্পটি এরই মধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদিত হয়েছে। এর লক্ষ্য শুধু পানি ধরে রাখা নয়, বরং সংরক্ষিত পানি পরিকল্পিতভাবে পার্শ্ববর্তী নদী ব্যবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া।

এ জন্য গড়াই, চন্দনা ও হিসনা নদীতে পৃথক অফটেক নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। রাজবাড়ীর পাংশায় চন্দনা অফটেক, কুষ্টিয়ায় গড়াই অফটেক এবং দৌলতপুরে হিসনা অফটেকের মাধ্যমে পানি গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া ও হিসনা-মাথাভাঙ্গা নদী ব্যবস্থায় প্রবাহিত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো পুনরুজ্জীবিত করা, শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি কমানো, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ, সেচ সুবিধা বাড়ানো, নৌ চলাচল উন্নয়ন এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা। এই লক্ষ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদী আজ শুষ্ক মৌসুমে ক্ষীণ প্রবাহ, প্রবাহহীন বা প্রায় মৃত অবস্থায় থাকে। গড়াই-মধুমতী, কুমার, চন্দনা, বারাশিয়া, মাথাভাঙ্গা, কালীগঙ্গা ও নবগঙ্গার মতো নদীগুলো একসময় কৃষি, মৎস্য, নৌযান, বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। কিন্তু পদ্মা থেকে পর্যাপ্ত প্রবাহ না আসা, পলি জমা, দখল, ভরাট, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং নদীপথ পরিবর্তনের কারণে এসব নদীর স্বাভাবিক প্রাণশক্তি অনেকটাই ক্ষয় হয়েছে।


তবে প্রকল্পটির সম্ভাবনা যেমন বড়, তেমনি এর ঝুঁকিও সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ব্যারাজ নির্মাণের ফলে উজানে পানির স্তর বাড়বে—এটি স্বাভাবিক।

কিন্তু সেই পানি কোন নদীপথে, কত পরিমাণে, কোন মৌসুমে এবং কিভাবে প্রবাহিত হবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। গড়াই ও চন্দনার মতো নদীগুলো দীর্ঘদিনের পলি জমা, দখল, ভরাট ও প্রবাহ সংকটের কারণে অনেকাংশে স্বাভাবিক বহনক্ষমতা হারিয়েছে। তাই পানি ব্যবস্থাপনায় সামান্য ভুলও বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।


এ কারণে প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ে Hydrological Impact Assessment, Morphological Assessment, Environmental Impact Assessment, Social Impact Assessment এবং Cumulative Impact Assessment-সহ প্রয়োজনীয় সমীক্ষা যথাযথভাবে সম্পন্ন হওয়া প্রত্যাশিত। তবে এসব সমীক্ষার ফলাফল, সীমাবদ্ধতা ও সুপারিশ সাধারণ মানুষের সামনে উন্মুক্ত থাকা জরুরি। কারণ এত বড় নদী ও পানি নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের সঙ্গে পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য, জনজীবন, স্থানীয় অর্থনীতি এবং উজান-ভাটির সম্পর্ক গভীরভাবে জড়িত। তাই সমীক্ষা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, প্রকাশ্য ও অংশগ্রহণমূলক হওয়া উচিত।


এ ক্ষেত্রে গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্পের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ১৯৬০-এর দশকে গঙ্গার পানি ব্যবহার করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সেচ সম্প্রসারণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। কিছু এলাকায় এটি সেচ সুবিধা ও কৃষি উৎপাদনে ভূমিকা রাখলেও দীর্ঘ মেয়াদে প্রত্যাশিত সামগ্রিক সুফল নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ আছে, প্রকল্পের পরবর্তী সময়ে কুমারসহ দক্ষিণমুখী কয়েকটি নদী স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে; অনেক নদী ও খাল পলি জমে ভরাট হয়েছে; কোথাও জলাবদ্ধতা বেড়েছে, আবার কোথাও শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। তাই পাংশায় পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নের আগে গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্পের সাফল্য, সীমাবদ্ধতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।


ফারাক্কা ব্যারাজের অভিজ্ঞতাও শিক্ষণীয়। ভারত ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণ করেছিল গঙ্গার পানি ভাগীরথী-হুগলি নদী ব্যবস্থায় প্রবাহিত করে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষা ও পলি অপসারণে সহায়তার উদ্দেশ্যে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ফারাক্কাকে ঘিরে পলি জমা, নদীতল উঁচু হওয়া, নদীর তীরভাঙন এবং বন্যার প্রকোপ বৃদ্ধির অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বিহারে এ নিয়ে রাজনৈতিক ও পরিবেশগত বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বিহারের বন্যার জন্য ফারাক্কাকে এককভাবে দায়ী করার মতো যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই বলেও মত রয়েছে। অর্থাৎ ফারাক্কার প্রভাব নিয়ে একমত সিদ্ধান্ত না থাকলেও এটি স্পষ্ট যে বড় নদী ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক।


গঙ্গা-কপোতাক্ষ ও ফারাক্কা—দুই অভিজ্ঞতাই দেখায়, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বড় পরিবর্তন আনলে প্রত্যাশিত সুফলের পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাবও দেখা দিতে পারে। তাই পাংশায় পদ্মা ব্যারাজের ক্ষেত্রে পলি ব্যবস্থাপনা, নদীতল পরিবর্তন, ভাটির প্রবাহ, তীরভাঙন, জলাবদ্ধতা এবং স্থানীয় নদী-খাল ব্যবস্থার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব আগে থেকেই গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও