জমিদারতন্ত্রের বিলুপ্তি : শোষণের শৃঙ্খল ভাঙার ইতিহাস
বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবর্তনের ধারায় বহুল আলোচিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কিংবা জমিদারি প্রথা কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল না, বরং এটি ছিল এ জনপদের কৃষকের শোষণ করার একটি নৃশংস হাতিয়ার। সেই হাতিয়ারটির অবসান ঘটে ১৯৫০ সালের ১৬ মে। এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। দীর্ঘদিনের শোষণ, অনাচার থেকে মুক্তির একটি দিন। বাংলাদেশ বাংলাদেশিদের জন্য হয়ে ওঠার দিবস। বাংলার মানুষ যে কয়েকটি শর্তের মাধ্যমে ভারত থেকে আলাদা হওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছিল, জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ ছিল তারই একটি।
Advertisement
আরও দেখুন
জাতীয় সংবাদ
মুদ্রাস্ফীতি বিশ্লেষণ
ই-পেপার অ্যাক্সেস
ব্রিটিশ আমলের বেশির ভাগ সময় বাংলার কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এ প্রথাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘জমিদার’ শব্দটি সুলতানি ও মোগল আমল থেকেই বিদ্যমান ছিল। তবে ওই সময়ের জমিদাররা ছিলেন মূলত রাষ্ট্রের অনুগত রাজস্ব আদায়কারী; জমির নিরঙ্কুশ মালিকানা তাদের হাতে ছিল না। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি লাভ করার পর ভূমিব্যবস্থায় এক অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নানা পরীক্ষার পর ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ প্রবর্তনের মাধ্যমে কয়েক প্রজন্মের চাষি ও রায়তদের চিরাচরিত মালিকানার অবসান ঘটিয়ে জমিদারদের জমির স্থায়ী মালিক হিসাবে স্বীকৃতি দেয় ব্রিটিশ প্রশাসন। এর মাধ্যমে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ আসলে তাদের বশংবদ একটি লাঠিয়াল শ্রেণি তৈরি করেছিল। এদের কাজ ছিল একদিকে ব্রিটিশদের স্বার্থ রক্ষা করা, অন্যদিকে কৃষকদের রক্ত শুষে নিয়ে তাদের নির্জীব করে ফেলা। আবার এসব জমিদারের বেশিরভাগই কিন্তু আগের জমিদারদের অধীনে গোমস্তা-জাতীয় পদে নিয়োজিত ছিল। নানা কৌশলে আগের জমিদারদের হটিয়ে তারা তাদের মালিকানা নিশ্চিত করেছিল।
নতুন এ ব্যবস্থার ফলে বাংলার কৃষি ও কৃষকসমাজ এক দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মুখে পড়ে। কৃষকরা তা কখনো মেনে নেয়নি। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে সৃষ্ট এ প্রাতিষ্ঠানিক জুলুমের বিরুদ্ধে বাংলার কৃষক বারবার সংগঠিত হয়েছেন। জমিদারি প্রথার মধ্যে কেবল আর্থিক বা রাজনৈতিক বিষয়ই ছিল না। এতে ধর্মীয় উপাদানও ছিল। ব্রিটিশদের প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা এসব জমিদারের বেশিরভাগই ছিল বর্ণহিন্দু। তারাই শোষণের কাজটি চালিয়েছে প্রবলভাবে। মুসলিম প্রজাদের বিরুদ্ধে তারা ছিল অনেক বেশি কঠোর। ধর্মীয় সম্প্রীতি, সামাজিক বন্ধন সবকিছুই তছনছ করে দেয় তারা। বাংলাদেশ অঞ্চলে সাধারণ মানুষ ছিল মুসলমান। আর জমিদাররা হিন্দু। এটাই সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হয়েছে। আসাদ উল হক উদাহরণ হিসাবে দেখিয়েছেন, বগুড়া জেলায় মোট জনসংখ্যার শতকরা ৮০ জনের ওপর মুসলমান; কিন্তু এ স্থানে জমিদাররা ছিলেন হিন্দু। ১৯১১ সালে রাজশাহী জেলায় জনসংখ্যার ৭৮ জন ছিল মুসলমান, শতকরা ২১ জন হিন্দু। কিন্তু সেখানে মুসলমান জমিদার ছিল মাত্র ২ শতাংশ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিপুলসংখ্যক মুসলমান ছিল রায়ত, মহাজনরা ছিল প্রায় সবাই হিন্দু। ফড়িয়াদের ক্ষেত্রেও ছিল হিন্দুদের প্রাধান্য। অন্যান্য এলাকায় প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে।