ক্ষমতা, ন্যায্যতা এবং বিশ্বব্যবস্থার বিউপনিবেশায়ন

বিডি নিউজ ২৪ রঞ্জন সলোমন প্রকাশিত: ১২ মে ২০২৬, ১৪:৩৯

একমেরু বিশ্বব্যবস্থার অবসান


পশ্চিমা তাত্ত্বিকরা নব্বইয়ের দশকে মার্কিন-সোভিয়েত স্নায়ুযুদ্ধের অবসানকে পুঁজিবাদের চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে দেখেছিলেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের নেতৃত্বে তথাকথিত স্থিতিশীল, নিয়মনিষ্ঠ বা নিয়মনিষ্ঠ বিশ্বব্যবস্থার উত্থান ঘটে। কিন্তু তিন দশকে গড়ে ওঠা সেই বিশ্বব্যবস্থা এখন পতনের দ্বারপ্রান্তে। যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থা আজ ক্রমশ ভঙ্গুর, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং নৈতিকভাবে আপসকামী হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। ইতিহাস বড়ই নির্মম, খুব সহজে আদর্শিক খোপে তাকে আটকানো যায় না।


সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখায়, একুশ শতককে শুধু সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে বোঝা যাবে না; বৈশ্বিক সরবরাহ-শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতাও তাৎপর্যবাহী। ইরান গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি গতিপথে ঝুঁকি সৃষ্টি করে বিশ্ববাজারে অভিঘাত ফেলতে সক্ষম। কেবল প্রথাগত সামরিক শক্তি দ্বারা আমেরিকা ইরান যুদ্ধে কৌশলগত আধিপত্য ও স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ অর্জনে ব্যর্থ। এর ফলে নতুন শক্তির উত্থান এবং পুরোনো পরাশক্তির ধস নামছে।


অন্যদিকে, নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিধর দেশগুলো বিশ্বব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাচ্ছে। এশিয়ার উত্থান, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর আকাঙ্ক্ষা এবং পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অসন্তোষ মিলিয়ে এক গভীর ঐতিহাসিক দাবি সামনে এসেছে—বিশ্বব্যবস্থার বিনির্মাণ।


পশ্চিমা আধিপত্য কাঠামো


আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে ওঠেছে ঔপনিবেশিক বুনিয়াদের ওপর। ইউরোপীয় শক্তিগুলো বিভিন্ন অঞ্চল দখল, শোষণ ও অধীনস্থ করার মাধ্যমে বিপুল সম্পদ সংগ্রহ করেছিল। তবে তারা কেবল রাজনৈতিক শাসনেই থেমে থাকেনি। উপনিবেশ থেকে অর্জিত সম্পদের ওপর দাঁড়িয়ে ইউরোপে শিল্পায়নের ভিত্তি তৈরি করে এবং একটি বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলে। যেখানে ঔপনিবেশিক দেশগুলো ইউরোপের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল থাকে।


ফলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পরও ঔপনিবেশিক কাঠামো পুরোপুরি ভাঙেনি। পণ্ডিত ওয়াল্টার রডনি দেখিয়েছেন, কীভাবে উপনিবেশবাদ বহু দেশের অনুন্নয়নের জন্য দায়ী। সামির আমিন বিশ্বব্যবস্থাকে দুই ভাগে বিভক্ত করেন: অধিপতিশীল কেন্দ্র ও নির্ভরশীল প্রান্ত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই শক্তিশালী বন্দোবস্তে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। বরং ভোটিং পদ্ধতি ও নীতিগত কাঠামো দ্বারা অসম সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। যার মূল সুবিধাভোগী পশ্চিমা শক্তি।


এই আধিপত্যের আদর্শিক দিকও সমান শক্তিশালী। উদার গণতন্ত্র ও মুক্তবাজার অর্থনীতি কোনো বিকল্প নয়, বরং এক বিশ্বজনীন ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফ্রাঞ্জ ফানোর মতো সমালোচকেরা বলেন, প্রকৃত ঔপনিবেশিক মুক্তি শুধু পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণ দূর করলেই হবে না, বৈশ্বিক কাঠামোকে ভেঙে ফেলতে হবে। কেননা এই কাঠামোই দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্য টিকিয়ে রাখে।


একমেরুর সীমাবদ্ধতা


স্নায়ুযুদ্ধের পর পশ্চিমা শ্রেষ্ঠত্ব আরও শক্তিশালী হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বশক্তির অবিসংবাদী কেন্দ্রে পরিণত হয়। কিন্তু একমেরু বিশ্বব্যবস্থা এখন ধারণার চেয়েও বেশি ভঙ্গুর। যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক সেই ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অথচ এই মডেল দীর্ঘদিন বৈশ্বিক সমৃদ্ধির ভিত্তি ছিল।


বর্তমান ইরান সংকটও পুরোনো সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি নতুন বাস্তবতার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। বিপুল সামরিক সক্ষমতা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র স্থায়ী রাজনৈতিক ফল নিশ্চিত করতে পারেনি। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে ধারাবাহিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ঠেকাতে ব্যর্থ। জ্বালানি সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা একটি গভীর সত্য উন্মোচন করে। সেটা হল, ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে আন্তনির্ভরশীল বিশ্বে একমেরু ক্ষমতা কাঠামো আর যথেষ্ট নয়। কেননা আঘাত হানার সক্ষমতা টিকে থাকলেও স্থিতিশীলতা ধরে রাখার ক্ষমতা কমে গেছে।


বিকল্প শক্তির উত্থান


পশ্চিমাদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন অর্থনৈতিক শক্তির উত্থান। গত দুই দশকে এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং কূটনৈতিক পরিসর সম্প্রসারিত করেছে। এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও প্রভাবের ধরন বদলে যাচ্ছে।


চীনের দ্রুত শিল্পোন্নয়ন ও ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিশ্বব্যবস্থাকে নতুন রূপ দিয়েছে। পাশাপাশি ভারত, ব্রাজিলসহ অন্যান্য উদীয়মান শক্তিও বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। যা বৈশ্বিক ক্ষমতার বহুমাত্রিক প্রতিফলন। ব্রিকস এই বহুমাত্রিকতার এক অন্যতম মুখপাত্র। যদিও এসব দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও স্বার্থ সমরূপ নয়, তবুও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার অসমতা ও একপাক্ষিকতা নিয়ে তারা সবাই উদ্বিগ্ন।


এই প্রেক্ষাপটে দেশগুলো নতুন উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে এবং বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর প্রভাব কমানোর আকাঙ্ক্ষা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। তবে এই সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা যে নতুন শক্তিগুলোকে চূড়ান্ত বিজয় এনে দেবে, তা নয়। বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা বর্তমান বৈশ্বিক পরাশক্তির ভঙ্গুরতাকেই উন্মোচিত করে।


বহুমেরু এবং বৈশ্বিক দক্ষিণ


বৈশ্বিক দক্ষিণের জন্য বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের উত্থান নতুন সম্ভাবনা ও কৌশলগত স্বাধীনতার পথ খুলছে। এই ব্যবস্থায় কোনো একক মোড়ল থাকবে না। ফলে বৈচিত্র্যময় অংশীদারত্ব গড়ে তোলা, প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বেছে নেওয়া এবং বহির্বিশ্বের রাজনৈতিক চাপ থেকে দেশগুলো মুক্ত থাকার সুযোগ পাবে।


উন্নয়ননীতির ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। দেশগুলো বিকল্প পথ অনুসরণের সুযোগ পাবে, তা দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা হোক কিংবা আঞ্চলিক মৈত্রী। কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও অনেক রাষ্ট্র দ্বিমাত্রিক সম্পর্কের বদলে জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। অর্থাৎ, যে সম্পর্ক জাতীয় ও আঞ্চলিক স্বার্থকে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা দেবে, দেশগুলো সেই পথ বেছে নেবে।


অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধের অভিঘাত ইউরোপকে গভীর সংকটে ফেলেছে। জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা মহাদেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কাঠামোগত নির্ভরশীলতার জন্য হুমকি। অথচ ইউরোপের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এই পরিস্থিতি এক বৃহৎ বাস্তবতা সামনে আনে। আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমান বিশ্বের আন্তনির্ভরশীলতা ও বৈষম্য এতটাই গভীর যে, সুদূর আফ্রিকার সংঘাত ইউরোপকে নাড়িয়ে দিতে পারে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও