পেশাদারত্ব নিশ্চিত হলে গণমাধ্যমের অধিকাংশ সংকট সমাধান সম্ভব
গত ৩ মে মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের এক সপ্তাহের মাথায় আজ ১০ মে এক যুগ পূর্ণ করলো জাগো নিউজ। মুক্ত গণমাধ্যম বলতে কী বোঝায় এবং পৃথিবীতে কোনোদিন মুক্ত গণমাধ্যম বলে কিছু ছিল কি না বা এটা ‘সোনার পাথরবাটি’ কি না—সেই তর্ক বেশ পুরোনো। তবে এটা ঠিক যে, পৃথিবীর সব দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার চেহারা এক নয়। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের গণমাধ্যমগুলো যতটা রাষ্ট্রীয় প্রভাবমুক্ত থাকতে পারে—স্বৈরতান্ত্রিক, একনায়কতান্ত্রিক ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর গণমাধ্যমকে ততটাই চ্যালেঞ্জের মুখে থাকতে হয়। সেসবের মধ্যে পেশাদারত্ব বজায় রেখে যারা টিকে থাকতে পারে, তাদেরই সফল গণমাধ্যম বলা যায়।
জাগো নিউজ এক যুগ পূর্ণ করলো। একটি অনলাইন সংবাদ পোর্টালের এক যুগ টিকে থাকা সহজ কথা নয়। সংবাদ পোর্টাল তো বটেই, সংবাদপত্র এবং টেলিভিশন চ্যানেলের জন্যও এক যুগ টিকে থাকা; এই সময়ের মধ্যে বন্ধ না হওয়া কিংবা বন্ধের উপক্রম না হওয়া অনেক বড় সাফল্যের বিষয়। জাগো নিউজ কী করে এটা পারলো, তার পেছনে হয়তো দশটা কারণ আছে। কিন্তু লেখালেখির সূত্রে এই সংবাদমাধ্যমটির সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্কের সুবাদে যে উপলব্ধি হয়েছে সেটি হলো, জাগো নিউজ পেশাদারত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে। অন্তত অতিথি লেখকদের তারা যে সম্মান ও সম্মানী দেয়, সেটা দেশের অনেক প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলেও অনুপস্থিত।
এই কথাগুলো বলার কারণ, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সংকট নিয়ে আলোচনায় রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক ও করপোরেটের চাপকে যত বেশি সামনে আনা হয়, গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা নিজেদের দিকে সেভাবে আঙুল তোলেন না বা তারা নিজেরা কী করছেন; প্রতিষ্ঠানে পেশাদারির চর্চা কতটুকু করছেন—সেই আত্মসমালোচনার ভেতরে তারা ঢুকতে চান না।
যারা সংবাদপত্র ও সংবাদ পোর্টালে নিয়মিত লেখেন—সেটি হোক উপসম্পাদকীয় বিভাগ কিংবা সাহিত্য বিভাগে, কয়টা পত্রিকা ও পোর্টাল লেখদের নিয়মিত এবং সম্মানজনক সম্মানী দেয়, সেই তালিকা করলে অনেক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানই বিব্রত হবে। সেই জায়গায় জাগো নিউজ যে পেশাদারত্ব অব্যাহত রেখেছে—তার প্রশংসা করা উচিত। কারণ আমাদের দেশে খারাপ কাজের সমালোচনা যতটা হয়, ভালো কাজের প্রশংসা ততটা হয় না।
আসা যাক মূল প্রসঙ্গে। গণমাধ্যমের পেশাদারত্ব। পেশাদারত্বের চেয়ে ইংরেজি প্রফেশনালিজম শব্দটি বেশি জুতসই মনে হয়। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার অনেক সমস্যা থাকলেও এক নম্বর সমস্যা নিঃসন্দেহে পেশাদারির সংকট। সেটা যে কোনো অর্থেই। কর্মী নিয়োগ থেকে শুরু করে তার বেতন, বোনাস, ছুটি অন্যান্য সুযোগ সুবিধা এবং পদোন্নতির পদ্ধতি।
বাংলাদেশের কয়টা প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে কর্মী নিয়োগ দেয় এবং তাদের পদোন্নতিতে একটা স্ট্যান্ডার্ড নিয়ম অনুসরণ করে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। দেশের ‘সেরা’ গণমাধ্যম হিসেবে খ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীরাও কী ধরনের অপেশাদার আচরণের শিকার হন, সেই হাঁড়ির খবরও আমাদের অজানা নয়।
একটা প্রতিষ্ঠান কতটা পেশাদারির চর্চা করছে, তার বড় মানদণ্ড সেখানের কর্মপরিবেশ। একজন কর্মী যদি ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে তার অফিসে প্রবেশ করেন এবং বাড়ি ফেরার সময় একইভাবে আনন্দচিত্তে অফিস ছাড়েন—তাহলে বুঝতে হবে ওই অফিসের কর্মপরিবেশ ভালো। কিন্তু গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোয় একটা নিরপেক্ষ ও নির্মোহ অনুসন্ধান চালানো হলে দেখা যাবে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা কোনো না কোনো কারণে বিরক্তি নিয়ে অফিস ছাড়েন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস