আশা ছাড়া মানুষ মানুষের মতো বাঁচে না

কালের কণ্ঠ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রকাশিত: ০৯ মে ২০২৬, ১১:১০

সর্বনাশসাধনের ব্যাপারে প্রযুক্তির অবদানের প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে বৈকি। প্রযুক্তি জীবনযাপনকে এখন অবিশ্বাস্য রকমের সুযোগ-সুবিধা এনে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের ব্যবহার তুঙ্গে পৌঁছেছে। তবে এই যোগাযোগ মানুষকে যেভাবে পরস্পর বিচ্ছিন্ন করছে, সেটিও অভাবিতপূর্ব।


তিনজন মানুষ পাশাপাশি বসে আছে, তারা পরস্পরের যে কেবল পরিচিত তা-ই নয়, ঘনিষ্ঠ বন্ধুও, কিন্তু তাদের তিনজনের মধ্যে কোনো কথাবার্তা নেই, যদিও তিনজনই অত্যন্ত ব্যস্ত ছায়া-বন্ধুদের সঙ্গে কথাবার্তায়, মন্তব্য আদান-প্রদানে, তাদের আলাপের বুঝি শেষ নেই—এমন দৃশ্য অভূতপূর্ব নয় কি? কিন্তু তখন তো এটি খুবই প্রচলিত। অবস্থাপন্ন মানুষরা শুনেছি বন্ধুর অভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করছে এবং প্রচুর আনন্দ পাচ্ছে। ভিডিওতে খেলার বন্দোবস্ত ছিল, এখন জুয়ার সুব্যবস্থা হয়েছে; প্রকাশ্যে এবং নির্বিঘ্নে অনলাইন জুয়া খেলা চলছে। হাতের মুঠোয় থাকা প্রযুক্তির ব্যবহার নিজেই এখন দুর্দমনীয় এক নেশা প্রযুক্তিতে আপাত নিরীহ আগ্রহ যে কত দূর যেতে পারে তার একটি প্রমাণ ভারতের রাজধানীর নিকটবর্তী এক শহরের সাম্প্রতিক এক ঘটনা।


পরিবারটি আর্থিক সংকটে ছিল; তাদের তিনটি কন্যাসন্তান, বয়স যাদের ১২, ১৪ ও ১৬; তিনজনেরই বিনোদন ছিল অনলাইনে। অসহায় বাবা কন্যাদের ব্যবহার্য ডিভাইসগুলো কেড়ে নেন। মর্মাহত তিন বোন বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে।


প্রশ্নটি প্রায়ই ওঠে এবং ওঠাটা স্বাভাবিকও যে অনেক মানুষই তো কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা করছে, কিন্তু অত টাকা দিয়ে তারা করেটা কী? অতিধনীরা কেউ কেউ অবশ্য ভাবে যে উড়ে গিয়ে চাঁদে কিংবা মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপন করবে।


কিন্তু মর্ত্যে? আমেরিকাকে একসময়ে মনে করা হতো স্বপ্নের দেশ; টাকাওয়ালারা সেখানে থাকতে পছন্দ করতেন। কিন্তু সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে যে নানা কারণে, বিশেষ করে নিরাপত্তার ঘাটতি এবং ‘উন্নত’ জীবনযাপনে বিঘ্নের দরুন বিত্তবানদের অনেকেই আমেরিকা ছাড়তে চাইছেন। ছেড়ে যাবেনটা কোথায়? ইউরোপে? ইউরোপ তো আগের ইউরোপ নেই। যেখানেই যান, তাঁদের জন্য বিনোদনের উপায় কী হবে, সেটি আমাদের জানার কথা নয়। ওসব কাজ তাঁরা গোপনেই করে থাকেন।


করার জন্য নিজস্ব ক্লাব রয়েছে; অন্যান্য ব্যবস্থাও নিশ্চয়ই আছে। বিনোদনের উপকরণ হিসেবে মেয়েদের ব্যবহার করা প্রাচীন প্রথা, যে পুরনো ব্যবস্থা পুরনো হওয়ার নয়, পরিত্যক্ত হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। এপস্টেইন নামের এক আমেরিকাবাসী তাঁর বন্ধুদের পছন্দ ও চাহিদা অনুযায়ী বিনোদনের ওই বিশেষ উপকরণ সরবরাহ করে কেবল যে অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন তা-ই নয়, অত্যন্ত ক্ষমতাবানও হয়ে উঠেছিলেন। নায়ক-মহানায়কদের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল। ই-মেইলে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ ও কথোপকথন চলত। সেসব নথি লুকানোই ছিল। চেষ্টা করা হয়েছিল নষ্ট করে ফেলার। কিছু নথি নাকি আর পাওয়া যাবে না। জগদ্বিখ্যাত জননায়ক ডোনাল্ড ট্রাম্পও এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন; নথি নষ্ট করার ব্যাপারে তাঁরও আগ্রহ থাকার কথা। আগ্রহ ছিল না যে এমনও নয়। তৎসত্ত্বেও এপস্টেইনের পক্ষে তাঁর অপরাধগুলোকে গোপন রাখা সম্ভব হয়নি; মাত্রায় অত্যধিক হওয়ার দরুন ঢাকনা ভেদ করে কিছু বেরিয়ে পড়ায় তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন এবং ক্ষমতার দিক থেকে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন দেখেই হয়তো আত্মহননের মধ্য দিয়ে আটক অবস্থায়ই পরলোকে গমন করেছেন।


এপস্টেইনের পাঠানো এবং তাঁকে পাঠানো ৩০ লাখ নথি এরই মধ্যে ফাঁস হয়ে গেছে। আরো নথি পাওয়া যাবে এমন সম্ভাবনা। স্বনামধন্য উদ্ভাবক ও দানবীর বিল গেটসও নাকি পরলোকগত এপস্টেইনের বন্ধুদের একজন ছিলেন। বিল গেটসের বিবাহবিচ্ছেদের পেছনে ওই বন্ধুত্বের ভূমিকা কতটুকু সে ব্যাপারে নিশ্চিত না হওয়া গেলেও এটি তো জানা গেছে যে ওই বন্ধুত্বের জন্য সংকোচে তিনি ভারতে অনুষ্ঠিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক এক সম্মেলনে যোগদান থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন, যদিও ওই বুদ্ধিমত্তার নতুন বিকাশের ঘটনায় তিনি উদ্বিগ্ন বলে আগেই জানিয়েছিলেন। এপস্টেইনের সঙ্গে বন্ধুত্বের বোঝা সামাজিকভাবে বহনে অসমর্থ হয়ে নরওয়ের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আত্মহত্যার উদ্যোগ নিয়েছিলেন; একসময়ে ইনি নাকি আবার ছিলেন নোবেল পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের মহাসচিব। এপস্টেইনের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের সম্পর্কটা পরোক্ষ হলেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ওপরে চাপ এসে পড়েছে পদত্যাগের। এপস্টেইনের ই-মেইল যোগাযোগ প্রসারিত ছিল তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা পর্যন্ত। ভারতীয় এক আধ্যাত্মিক বক্তার সঙ্গে এপস্টেইনের বন্ধুত্ব এতটাই নিবিড় ছিল যে এপস্টেইনকে তিনি একজন ‘সুন্দরী স্বর্ণকেশী’কে খুঁজে দিতে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সরবরাহের অনুরূপ অনুরোধ একজন ভারতীয় ধনকুবেরও যে জানিয়েছিলেন এমন খবরে অবাক হওয়ার কী আছে! এপস্টেইন সাহেব যে কেবল সুন্দরী নারীর বন্ধুত্বপ্রাপ্তিতেই নিকটজনদের সাহায্য করতেন তা নয়, বড় বড় ব্যবসায়ীকে বড় বড় কাজ পাইয়ে দেওয়ার ব্যাপারেও সহায়তা দিতেন বলে জানা গেছে। লন্ডনের টেমস নদীর তীরে কয়েক শ কোটি পাউন্ড ব্যয়ে নির্মিত একটি বন্দর নির্মাণে ঠিকাদারি পাইয়ে দেওয়ার ব্যাপারে ডিপি ওয়ার্ল্ড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য তিনি বন্ধুর ভূমিকা পালন করেছিলেন। এটি আবার সেই কম্পানি, যাকে আমাদের চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়ার ব্যাপারে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার রীতিমতো অস্থির ছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা তো অমৃত সমান; তিনি বলেছেন, এপস্টেইন অধ্যায় অতিক্রম করে আমেরিকার পক্ষে এগিয়ে যাওয়া উচিত। তিনি তাঁর কথার অমর্যাদা ঘটাননি; আমেরিকার মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করে দেশটিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে তিনি ইরানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার উত্তেজক কাজে ব্যাপৃত করেছেন। এ জগতে হায় এপস্টেইনরা হয়তো আত্মহত্যা করেন, তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পরা অপ্রতিহত গতিতে উন্নতি করতেই থাকেন। থাকবেনও।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও