সময়ের শিকল পায়ে মুক্তির সুখ কি মেলে
দুনিয়াটা বহু সুন্দরে পূর্ণ। আরও সৌন্দর্য, শোভা সৃষ্টির জন্য বহু মানুষকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সে মানুষেরা ছবি আঁকে, গায়, সুর করে, নাচে, লেখে, বাজায়, অভিনয় করে। আরও বহু রকম সৃজনশক্তি মানুষকে দেওয়া হয়েছে তার কারণ, মানুষের মনে যেন বিস্ময় জাগে, যেন মুগ্ধ হয়। মুগ্ধ হয়ে মানুষ যেন ভাবে, অনুভব করতে পারে, তার বাস করা দুনিয়াটা খুব বিশেষ একটা স্থান।
অনেক মানুষ তা অনুভব করতে পারে। পারে বলেই জগৎ-সংসার এবং এখানে ঘটা বহু বিশেষত্বে মানুষ আকৃষ্ট হয়, নিজেকে ভাবনার সাম্রাজ্যে নামিয়ে দেয়। সে সাম্রাজ্য কূলকিনারাহীন, তবু মানুষ ভাবতে নামে। সুন্দরের প্ররোচনায় অনুভব করতে পারে, এত বড় একটা দুনিয়ায় মানুষ হিসেবে আমি খুবই সামান্য। একজীবনে এ দুনিয়ার খুব কম সৌন্দর্যকে জানাবোঝা হবে।
আমাদের দেশে একসময় শিল্পী ও সৃজনশীলতাকে আলাদা চোখে দেখা হতো। ‘একসময়’ এবং ‘হতো’ শব্দ দুটো উচ্চারণ করতে হলো দুঃখের সঙ্গে। যা ছিল, তা নেই হয়ে যাওয়া কম দুঃখের নয়।
ছোটবেলায় দেখা যাত্রাপালায় যে ছেলেটি ‘আলোমতি প্রেমকুমার’-এ আলোর ভূমিকায় অভিনয় করেছে, তাকে বিস্ময় নিয়ে দেখেছে সবাই। তার দুঃখে কেঁদেছে, তার আনন্দে আনন্দিত হয়েছে।
যে ছেলেটা মাসের পর মাস ‘আল্লাহর দান’ নামে ইটের ভাটায় দিনে কাজ করে, সন্ধ্যাবেলায় সেই ছেলে নিয়মিত যাত্রার মহড়া দেয়। মহড়া দেওয়া পালা একদিন মঞ্চে ওঠে। প্যান্ডেলের মাঝখানে চারদিক খোলা মঞ্চ, সেই মঞ্চে গ্রামের ছেলে দুলু আলোমতি সেজে দুঃখ নিয়ে গান গায়, ‘আমি আলো একা ঘরে থাকি’। মানুষ হো হো করে হেসে ওঠে না, আলোর দুঃখে কাতর হয়।
এই কাতর হওয়াই কলার প্রতি সম্মান দেখানো। সাত ভাই চম্পা সিনেমায় একটা গাছের শাখায় শাখায় ফুল হয়ে ফুটে থাকা ভাইদের জাগাতে কাঁদতে কাঁদতে চম্পা গান গায়, ‘ও সাত ভাই চম্পা জাগো রে’। দর্শকের বুকে ঢিপঢিপ শুরু হয়ে যায়, রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করে সবাই—তাকিয়ে থাকে, এইবার, এখনই জেগে উঠবে ভাইয়েরা।
যে গাছটার সামনে সাত ভাইয়ের একমাত্র বোন চম্পা দাঁড়িয়ে কাঁদছে আর গাইছে, সেটা বানানো গাছ। বানানো গাছের শাখায় শাখায় যে ফুলগুলো ফুটে আছে, সবই কাগজের তৈরি। সাত ভাইয়ের একমাত্র বোন চম্পা সেজেছে অভিনেত্রী কবরী, নকল চম্পা। তবু সেই নকল চম্পাকে আসল বলে বিশ্বাস করে দর্শক। পর্দায় চম্পার কষ্টে, ক্রন্দনে দর্শকেরও চোখ ভিজে যায়।
সত্য-মিথ্যা একাকার হয়ে যায় আন্তরিকতা, বিশ্বাসে। এই দুটোর যদি নড়চড় হয়, মন আর মন থাকে না, মন হয়ে যায় ছাঁকনি। ছাঁকনির কাজ হচ্ছে ছাঁকা। ভারী পদার্থ থেকে হালকা বা পাতলা পদার্থ আলাদা করে নেওয়া।
যাত্রাপালায় আলোমতি প্রেমকুমারের প্রেম দেখে বিশ্বাস করা হয় বলে সুখ মেলে। তার ক্রন্দনও দর্শক বিশ্বাস করতে চায় বলে চোখ ভিজে আসে। যে মানুষের মন বিশ্বাসহীন, কোনো কলাতেই সে মানুষ মুগ্ধ হতে পারে না, পারবে না। এমন মন পৃথিবীর বহু সুন্দর থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে।
বিচ্ছিন্নতা হচ্ছে থেকেও না থাকা, দেখেও না দেখা, শুনেও না শোনা, বুঝতে চাওয়ার, অনুভব করার দায় না থাকা। কাছের কারও মৃত্যু হয়েছে। শুনে বুক ফেটে কান্না আসে। মানুষ কাঁদে মৃত্যু কী, তা পূর্ণমাত্রায় অনুভব করতে পারে বলে।
কারও গান শুনছি। শুনছে কান। চোখ দেখছে শিল্পীর শাড়ি, গয়না, সাজগোজ। মন ভাবছে, এই শিল্পীর সদ্য বিয়ে হয়েছে। এদের বিয়ে হয়, ভাঙে; আবার বিয়ে হয়। নাচ-গান, অভিনয় করা মেয়েদের দিয়ে সংসার হয় না।
অনুষ্ঠান থেকে ফিরে ফেসবুকে পোস্টানোর ইচ্ছা হলো। গান শোনাই হয়নি, অতএব বর্ণনায় গানের কথা থাকবেই না। যা যা দেখা হয়েছে, অতি অশ্রদ্ধার সঙ্গে সেসবই লেখা হবে।
এভাবে, এমন দায়িত্বহীন স্বভাবের কারণে রোজই ব্যাপকভাবে শিল্প ও শিল্পী অপমানিত হয়, হচ্ছে। গড়ে উঠছে দেশটার ভেতরে অন্য একটা বাংলাদেশ।
একটা ছবির সামনে দাঁড়িয়ে যে দর্শকের মনে বিস্ময় জাগে, সে মানুষটার মনে বিস্মিত হওয়ার বাসনা থাকে। তা থাকে বলেই তিনি বিস্মিত হন। যেসব মনে কোনো সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়ার তাগিদ, ইচ্ছা বা কোনো কিছুর গভীরে যাওয়ার বাসনা থাকে না, তিনি শুধু ছবিটা ছাড়া চারপাশের সবকিছু দেখেন, মনোযোগ দিয়ে দেখেন।