ক্ষমতার রাজনীতি ও গুপ্ত রাজনীতির পাকে বাংলাদেশ
দেশের জনগণ কি কোনো সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছে আর? শঙ্কা নিয়ে মনে, তারা কি ভাবছে, যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ? এই তো, ফেব্রুয়ারি মাসে হয়ে গেল জাতীয় নির্বাচন। সেই নির্বাচনে যে কথামালার রাজনীতি হয়েছে, তাতে কি খুব একটা বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তা শোনা গেছে? শোনা গেছে শিক্ষা নিয়ে কথা? স্বাস্থ্য নিয়ে কথা? কৃষক নিয়ে কথা? কীভাবে কৃষককে বাঁচানো যায়, কীভাবে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া যায়, কীভাবে বেকারত্ব দূর করা যায়, তৈরি করা যায় নতুন কর্মসংস্থান, কীভাবে জনগণের স্বাস্থ্যরক্ষার প্রশ্নটির সমাধান করা যায়, তা কি দেখা গেছে নির্বাচনী ভাষণে? নাকি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আর আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণের চর্বিত চর্বন দিয়েই ঘেরা ছিল নির্বাচনী মাঠ? নিজেদের ইশতেহারে যে বিশাল সব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য কি কোনো দিকনির্দেশনা পাওয়া গেছে? ইউনূস-আলী রীয়াজ যুগলবন্দী যে ছিল বেসুরো, আরও স্পষ্ট করে বললে, সৃষ্টিছাড়া; সে কথা কি আদৌ রাজনৈতিক দলগুলো বোঝেনি?
দেশের মানুষের রক্ত-ঘামে অর্জিত প্রচুর অর্থ খরচ করে আলী রীয়াজ ফিরে গেছেন তাঁর যুক্তরাষ্ট্রের কর্মস্থলে। মাঝখানের সময়টায় তিনি একটি প্রকাণ্ড অশ্বডিম্ব প্রসব করেছেন, এটুকুই যা অর্জন। নানা নাটুকেপনার পর যে নির্বাচন হলো, তা কি সত্যিই স্বস্তি আনতে পারবে জনমনে? এই সরকারের জন্য হানিমুন পিরিয়ড নেই বললেই চলে। কিংবা বলা চলে, ২০২৫ সালের জুন মাসে যখন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা লন্ডনে গেলেন তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করতে, তখন থেকেই বিএনপির হানিমুন পিরিয়ড চলছিল। যে কারণে অনেকেই মনে করে থাকেন, সরকার গঠনের আগে থেকেই বিএনপি ক্ষমতার যে আমেজ পেয়েছে, সেটাই হানিমুন পিরিয়ডের প্রয়োজনীয়তা বিলোপ করেছে। কিন্তু কথাটি কি আদৌ সত্য? ইউনূস সরকার মাঝে মাঝেই জামায়াত-এনসিপির দিকে গোত্তা খেয়েছিল বলেও তো অনেকে মনে করেন। যেভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দখলের হিড়িক পড়ে গিয়েছিল, সে কথা কি দেশবাসী ভুলে গেছে?
অনেকেই বলে থাকেন, জনগণ কিছুই ভোলে না। নির্বাচনের একটি দিনেই তারা তাদের মতামত জানিয়ে দেয়। ক্ষমতাসীন দলের পরিবর্তন হয়। কিন্তু নতুন ক্ষমতায় আসা দলও হঠাৎ করে মনে করতে থাকে, তারাই শুধু জাতিকে উদ্ধার করার সার্টিফিকেট পেয়ে গেছে। অন্য কারও পরামর্শ শোনার কোনো সদিচ্ছা তাদের মধ্যে লক্ষ করা যায় না। ফলে নতুন ধরনের একটা শুরুর কথা বলা হলেও সবই চলে পুরোনো নিয়মে। শাসক বদল হয়—এটুকুই শুধু সত্য হয়ে দেখা দেয়। বাকিটা কী হয়, তা জনগণ টের পায় দিনে দিনে। যখন পুরোটা বুঝতে পারে, তখন আবার নতুন করে অন্য কাউকে নির্বাচিত করার কথা ভাবে। এবং বারবার তারা একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে পেলেও বিস্ময়করভাবে আবার আশায় বুক বাঁধে। যেমনটা বেঁধেছিল ড. ইউনূসের কথা ভেবে। কিন্তু এই অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বারা এভাবে প্রতারিত হবে, সেটা কি একবারের জন্যও ভেবেছিল জনতা?
নতুন সরকারকে চেপে ধরতে চাইছে বিরোধী দল। সরকারি দলের সদস্যরাও নিজেদের অজনপ্রিয় করে তোলার খেলায় শামিল হয়েছেন। কোনো কোনো মন্ত্রী যখন লাগাম ছাড়া কথাবার্তা বলছেন, তখন তাঁদের কেন সতর্ক করে দেওয়া হচ্ছে না, সেটা বোঝা কঠিন। এমনকি কার কথা কে বলছেন, সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আইনমন্ত্রী আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীবিষয়ক সমালোচনা এখন টক অব দ্য টাউন। মন্ত্রীরা যত বেশি কথা বলবেন, তত বেশি ভুল করবেন। এখন যুগটাই পাল্টে গেছে। একটা বেফাঁস কথা বলে ফেললে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছুলে ফেলা হয়। কথা মাটিতে পড়ার আগেই তা নিয়ে ট্রল শুরু হয়ে যায়।
যে কথাটা বারবার বললেও ক্ষমতাসীনেরা বোঝেন না, সে কথারই পুনরাবৃত্তি করি। ক্ষমতায় আসার পরপরই তাঁদের নিজেদের অলক্ষ্যে একটা বলয় তৈরি হয়ে যায়। এই বলয় ভেদ করে বাস্তবতা দেখার আর সুযোগ থাকে না। এই বলয়ে শুধু উন্নয়নের স্বপ্ন দেখা যায়। সাধারণ মানুষ কী ভাবছে, তা নেতার কাছ থেকে আড়াল করে রাখে এই বলয়। যেকোনো অসন্তোষকেই দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা থাকে। এবং তারপর? তারপর কখন পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেছে, সেটা বুঝে ওঠার আগেই মসনদ কেঁপে ওঠে।
সদ্য ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার যেন পা হড়কে পড়ে না যায়, সেটা নিশ্চিত করতে হলে নেতার চারপাশে চাটুকারের মেলা বসতে দেওয়া একেবারেই উচিত হবে না। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নেতাকে নিয়ে গান হয়েছে সংসদে, বিএনপির সময় সংসদে আবৃত্তি হয়েছে নেতার স্তুতি করা কবিতা। এগুলো কিসের ইঙ্গিত দেয়, তা নিয়ে নিশ্চয়ই সরকারের বিজ্ঞজনেরা ভাববেন।
২.
এরই মধ্যে ‘গুপ্ত’ শব্দটি নিয়ে টালমাটাল হয়ে উঠেছে দেশ। ‘ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি কলা খাই না’ পরিস্থিতির সূচনা হয়েছে চট্টগ্রামের সিটি কলেজে। কুশীলব জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আর ইসলামী ছাত্রশিবির। ক্যাম্পাসের এক গ্রাফিতিতে লেখা ছিল, ‘ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস’। ছাত্রদলের সদস্যরা ‘ছাত্র’ শব্দটি কেটে ‘গুপ্ত’ শব্দটি বসিয়ে দিয়েছেন। এই পরিবর্তনে স্বভাবতই একটা বার্তা আছে। ছাত্রদল মূলত ছাত্রশিবিরকে উদ্দেশ করেই শব্দ পরিবর্তন করেছে, এ কথা খোলাসা করে না বললেও সবাই বুঝতে পারে। ছাত্রশিবির এ ব্যাপারে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারত। চুপ করে থাকতে পারত। পাত্তা না দিতে পারত। কিন্তু তারা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দেশি অস্ত্র হাতে ‘গুপ্ত’ শব্দের পক্ষে-বিপক্ষে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়েছে। কেন ‘গুপ্ত’ শব্দটায় ছাত্রশিবিরের আপত্তি, তা জানতে কি কারও বাকি আছে?
মেধাবী শিক্ষার্থীরা ছাত্ররাজনীতিতে না এলে ছাত্ররাজনীতি হয়ে ওঠে পেশিনির্ভর। ভাবার কোনো কারণ নেই, ছাত্রলীগই কেবল ক্যাম্পাসজুড়ে দুঃশাসন চালিয়েছে অতীতে। প্রতিটি ছাত্রসংগঠনের কার্যক্রমের দিকে লক্ষ করলেই দেখা যাবে, ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে সেই সময়ের ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে ছাত্রলীগ, বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে ছাত্রদল, জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় থাকলে ছাত্রসমাজ ক্যাম্পাস দাপিয়ে বেড়িয়েছে। আর ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে রগকাটা রাজনীতি তো সমার্থক বলেও অনেকে মনে করে থাকেন। উদাহরণ চাইলে ভূরি ভূরি দেওয়া যাবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ক্ষমতার রাজনীতি