চ্যালেঞ্জ থাকলেও সম্প্রসারণমূলক বাজেটই প্রয়োজন
আগামী অর্থবছরের জন্য বাজেট ঘোষণার সময় একেবারেই সন্নিকটে। অর্থ মন্ত্রণালয়ে বাজেট প্রস্তুতির কাজ নিশ্চয়ই বেশ জোরেশোরে এগিয়ে চলেছে। প্রাক-বাজেট আলোচনাও প্রায় শেষের দিকে, যদিও এখনো বাজেট নিয়ে আলোচনা এবং লেখালেখি অব্যাহত আছে। এবারের বাজেটে কিছু বিশেষত্ব আছে।
প্রথমত, দীর্ঘ দুই বছর পর আবার মহান জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ হবে, আলোচনা হবে এবং সেই বাজেট পাসও হবে। আগের অর্থবছরের বাজেটে এই স্বাভাবিক পদ্ধতি অনুপস্থিত ছিল এবং অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে মনে করেছে, সেভাবেই বাজেট তৈরি করেছে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচিত বর্তমান সরকারের জন্য এটি হবে প্রথম বাজেট। তা ছাড়া এবার হবে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের বাজেট।
কেননা দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যে অর্থনৈতিক সংকট ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে, সেটি বিবেচনায় নিয়ে বাজেট প্রস্তুত করা নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রথম চ্যালেঞ্জটি আসবে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে। এই সময়ে দেশের অর্থনীতি একেবারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। দেশের জিডিপি ৬ শতাংশের ওপর থেকে ৩ শতাংশের কাছে চলে এসেছে।
জিডিপির এমন ধস এর আগে কখনো হয়েছে কি না আমার জানা নেই। এই জিডিপি টেনে তোলা মোটেই সহজ কাজ নয়। বিগত দেড় বছরে সরকারি খাত যেমন বাধাগ্রস্ত হয়েছে, বেসরকারি খাতও তেমনি মারাত্মভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই দুই খাতে গতি সঞ্চার করার জন্য যে মাত্রার ফিসক্যাল পলিসি সহায়তা প্রয়োজন, তা এই বাজেটে নিশ্চিত করা একেবারেই দুরূহ কাজ। আর্থিক বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে গেলে কর বাড়াতে হবে, যা জনগণ এবং দেশের ব্যবসায়ীদের আরো বেশি আর্থিক সংকটে ফেলে দেবে।
এমনিতেই দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা। তাই তাদের ওপর করের বোঝা বৃদ্ধি করার সুযোগ নেই।
ব্যবসায়ীদের অবস্থা আরো বেশি সংকটাপন্ন। প্রথমত, বেশির ভাগ ব্যবসায়ীর ক্রয়-বিক্রয় যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে এবং এর প্রভাবে মুনাফাও হ্রাস পেয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সরকারের কর আদায়ের পরিমাণও কমে গেছে। আগে যে ব্যবসায়ীর বার্ষিক মুনাফা ছিল দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা, তিনি সরকারকে কর প্রদান করতেন এক কোটি টাকা। এখন সেই ব্যবসায়ীর মুনাফা যদি হ্রাস পেয়ে দুই কোটিতে নেমে আসে, তাহলে তিনি সরকারকে কর পরিশোধ করবেন ৮০ লাখ টাকা। একইভাবে আমদানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় আমদানি শুল্ক আদায়ের পরিমাণও অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। এককথায় সরকারের রাজস্ব আদায়ের যতগুলো পথ খোলা আছে, সব ক্ষেত্রেই নিম্নগামী অবস্থা। ফলে সরকার কিভাবে রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করবে, সেটি এই মুহূর্তে বড় চ্যালেঞ্জ এবং সমস্যা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ, যার কারণে জ্বালানি সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন এবং জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। এই জ্বালানিসংকট এবং জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেকেই বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার শঙ্কা করছেন।
অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই যুদ্ধ শিগগিরই বন্ধ না হয়, তাহলে অর্থনৈতিক মন্দা অবশ্যম্ভাবী। আর যদি তেমনটি হয়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরো চাপে পড়ে যাবে। যদি যুদ্ধ বন্ধ হয়ও, তাহলেও শিগগিরই যে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে, তেমনটি ভাবার কারণ নেই। যুদ্ধ বন্ধ হলে বিশ্বব্যাপী মন্দা হয়তো এড়ানো যাবে, কিন্তু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি সংকটের মধ্য দিয়েই যাবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যাটি বেশি জটিল হওয়ার আশঙ্কা আছে। কেননা অন্যান্য দেশের কিছুটা হলেও প্রস্তুতি আছে। আমাদের দেশের তো কোনো রকম প্রস্তুতি নেই, উল্টো অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে সৃষ্ট ভয়াবহ সংকট বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা হয়ে আছে। এর বাইরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে আমেরিকায় প্রাইভেট ক্রেডিটকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিশৃঙ্খল অবস্থা ২০০৮ সালের সাবপ্রাইম মর্টগেজ কেলেঙ্কারির মতো এক আর্থিক সংকটের জন্ম দিতে পারে। বিষয়টি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে না পারলেও আমেরিকায় বিষয়টি নিয়ে বেশ জোরেশোরেই আলোচনা হচ্ছে। যদি প্রাইভেট ক্রেডিট সমস্যার সন্তোষজনক সমাধান না হয় এবং এ কারণে আমেরিকায় আর্থিক সংকট দেখা দেয়, তাহলে এর প্রভাব বিশ্বের অন্যান্য দেশেও পড়বে এবং বাদ যাবে না আমাদের দেশও। তাই বাজেট তৈরির সময় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যে সংকট আছে বা আরো সংকট দেখা দিতে পারে, সেই বিষয়গুলো সক্রিয় বিবেচনায় নিতে হবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জাতীয় বাজেট
- অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ