আইএমএফের সতর্কতায় কতটা ভয় পাওয়া উচিত
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গত মঙ্গলবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব মহামন্দার কবলে পড়তে পারে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই মহামন্দার সতর্কতা নিয়ে আমাদের, তথা বিশ্ববাসীর কতটা ভয় পাওয়া উচিত। এই প্রশ্নের কারণ হলো, মাত্র কয়েক বছর আগেই বিশ্ববাসী একটি মহামন্দার মধ্যে দিয়ে গেছে। পৃথিবীর সব মানুষের জীবনে সেই মন্দার প্রভাব পড়েছিল। তারপর বেশ দ্রুতই তার কবল থেকে মুক্ত হতে পেরেছে বিশ্ব। সেদিক বিবেচনায় কি এবারও এমন কিছু ঘটতে পারে? তাহলে তো খুব বেশি ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কারণ, কয়েকটা দিন কষ্ট করলেই আবারও অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে, ছুটতে শুরু করবে বল্গা ঘোড়ার মতো।
কিন্তু এবারের বাস্তবতা ভিন্ন। এবার যদি সত্যিই মহামন্দার কালো মেঘে পুরো পৃথিবী ছেয়ে যায়, তাহলে তার কবল থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হবে না। এমনকি মন্দার আঘাতে অর্থনীতির ‘বল্গা ঘোড়ার’ এক বা একাধিক পা ভেঙেও যেতে পারে। তেমনটা ঘটলে সেই ধাক্কা সামলে লাইনচ্যুত বিশ্ব অর্থনীতির আবারও লাইনে ফিরতে অনেকটা সময় লাগতে পারে। এমনকি এক বা একাধিক প্রজন্ম এই ধাক্কার প্রভাবের শিকার হতে পারে।
আইএমএফের তথ্যমতে, এবার যদি মহামন্দার কবলে পড়ে বিশ্ব, তাহলে এটি হবে ১৯৮০ সালের পর চতুর্থ মহামন্দা। তৃতীয় এবং এখন পর্যন্ত সর্বশেষ মহামন্দাটি আঘাত হেনেছিল কোভিড-১৯ মহামারির সময়। সেই ভয়াবহ সময়ের স্মৃতি আমাদের আজও তাড়িয়ে বেড়ায়। ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে ‘লকডাউন’ নামে নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল আমাদের। থেমে গিয়েছিল কারখানার চাকা, কর্মজীবীদের কাজ। জীবন আটকে গিয়েছিল ঘরে। এই মহামারি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এমন অচলাবস্থা সৃষ্টি করেছিল যে তা মহামন্দায় রূপ নিতে খুব বেশি সময় নেয়নি। তবে মহামারির আতঙ্ক কাটার পর সেই মহামন্দার প্রভাব কাটতেও বেশি সময় লাগেনি। মানুষ ঘরের বাইরে পা রাখতেই দৌড়াতে শুরু করে অর্থনীতি।
কিন্তু এবার মহামন্দার ঝুঁকি তৈরি করেছে একটি যুদ্ধ। দৃশ্যত যুদ্ধটি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের। কিন্তু যুদ্ধটি শুরুর পর ছয় সপ্তাহ না যেতেই বিশ্বের সব মানুষের জীবনে তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যুদ্ধের শুরু থেকেই অস্থির বৈশ্বিক তেলের বাজার। ইরান পাল্টা হামলা চালানো শুরু করলে তেলের দাম যেন রকেটের গতি পায়। সেই গতি আরও বেড়ে যায় তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর।
হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে উত্তর-পূর্বে ওমান উপসাগর এবং দক্ষিণ-পূর্বে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন বৈশ্বিক মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের ২০ শতাংশ করে পরিবহন হতো এই প্রণালি দিয়ে। সে হিসাবে হরমুজ প্রণালিকে বলা যায় বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান ধমনি। কারণ, পারস্য উপসাগর থেকে বের হতে হলে এই প্রণালিই একমাত্র পথ। আর পারস্য উপসাগরের তীরে ইরান, সৌদি আরব, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষ তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী আটটি দেশের অবস্থান।
হরমুজ বন্ধ হওয়ার পর জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ মার্কিন ডলারে গিয়ে ঠেকেছিল। তারপর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনার আভাসে সে দাম কমে আবার নব্বইয়ের ঘরে ফিরেছিল। আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর দাম উঠেছিল ৯৮ ডলারে। এরপর আবারও আলোচনার আভাসে গতকাল বুধবার দাম ঘোরাফেরা করেছে ৯৪ ডলারের আশপাশে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, হরমুজ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে সৌদি আরবের অপর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ—লোহিতসাগর? লোহিতসাগর দিয়েও পণ্য পরিবহন হয়। কিন্তু সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলো লোহিতসাগরকে প্রধান রপ্তানি রুট হিসেবে বিবেচনায় নেয়নি কখনো। তারা পারস্য উপসাগরকে প্রাধান্য দিয়েছে সব সময়। আর এ কারণেই এই উপসাগরের তীরে দেশগুলো গড়ে তুলেছে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর লোহিতসাগরে পণ্য পরিবহনের চাপ কিছুটা অবশ্য বেড়েছে। তবে সেখানেও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের উৎপাত রয়েছে।
এবার আসা যাক, তেলের দাম কীভাবে অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে, সে আলোচনায়। আমি অর্থনীতিবিদ নই। কাজেই কোনো তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে যাব না। সহজ-সরল ভাষায় বিষয়টা উপস্থাপনের চেষ্টা করব। বিশ্ব এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর পুরোমাত্রায় নির্ভরশীল। রাস্তায় আমরা যত যন্ত্রচালিত যানবাহন দেখি, এলাকায় এলাকায় যত কারখানা দেখি, আমাদের ঘরে যে বিদ্যুতের সরবরাহ—তার বেশির ভাগই তেল ও গ্যাসনির্ভর। বিদ্যুৎ উৎপাদনে অবশ্য কয়লার ব্যবহারও হয়। আবার পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে পানির প্রবাহ ও সৌরশক্তিও ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এসবের ব্যবহার তেল ও গ্যাসের তুলনায় অনেক কম।