নববর্ষের পান্তা-ইলিশ এখন প্রিমিয়াম পণ্য

কালের কণ্ঠ ড. মো. ফখরুল ইসলাম প্রকাশিত: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৩:২৩

বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ, যার নাম উচ্চারণেই জেগে ওঠে নদীমাতৃক দেশের স্বাদ, সংস্কৃতি ও আবেগ। কিন্তু সেই ইলিশ মাছ আজ এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি। যে মাছ একসময় ছিল গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে সহজলভ্য, তা এখন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে প্রিমিয়াম পণ্যে। অর্থাৎ ইলিশ এখন আর সবার মাছ নয়, এটি ক্রমেই নির্দিষ্ট শ্রেণির ভোগ্যপণ্যে রূপ নিচ্ছে। এই রূপান্তর আমাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক বৈষম্য ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতারও প্রতিফলন।


গত এক দশকে ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। সরকারি উদ্যোগে মা ইলিশ সংরক্ষণ, জাটকা নিধন বন্ধ, অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা এবং জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান—এসব পদক্ষেপ ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশ আজ ইলিশ উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় দেশ হিসেবে স্বীকৃত।

কিন্তু এই সাফল্যের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা। সেটি সবার জানা, বাজারে ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ইলিশের এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক কারণ। প্রথমত, সরবরাহব্যবস্থার জটিলতা ও মধ্যস্বত্বভোগীর আধিপত্য।

জেলে থেকে শুরু করে আড়তদার, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতা—প্রতিটি স্তরে মুনাফা যোগ হয়ে চূড়ান্ত বাজারমূল্য কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এই দীর্ঘ সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল ভোক্তার কাছে পৌঁছে না।


দ্বিতীয়ত, বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষ করে উৎসব মৌসুমে পহেলা বৈশাখ, দুর্গাপূজা কিংবা ঈদ আসার আগেই এবং ইলিশের চাহিদা বাড়লেই কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। এতে দাম হঠাৎ করে লাফিয়ে ওঠে। ফলে ইলিশ হয়ে ওঠে এক ধরনের ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’, যা কিনতে পারা মানেই সামাজিক অবস্থানের প্রকাশ।


তৃতীয়ত, রপ্তানিনীতিও ইলিশের দামে প্রভাব ফেলে। প্রতিবেশী দেশসহ আন্তর্জাতিক বাজারে ইলিশের চাহিদা বাড়ায় রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও এটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য ইতিবাচক, কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাজারে এর প্রভাব নেতিবাচক। সরবরাহ কমে গেলে দাম বাড়ে, আর সেই চাপ পড়ে সাধারণ ভোক্তার ওপর।


চতুর্থত, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ। জেলেদের সমুদ্রে যেতে বাড়তি খরচ হচ্ছে, আবার মাছ বাজারে আনতেও খরচ বেড়েছে। এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপানো হয়। ফলে ইলিশের দাম হয়ে ওঠে আরো চড়া।


তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, ইলিশ এখন সামাজিক বৈষম্যের প্রতীক হয়ে উঠছে। উচ্চবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য ইলিশ কেনা এখনো সম্ভব হলেও নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এটি প্রায় অধরাই। একসময় যে মাছ ছিল গরিবের প্রোটিন, তা এখন ধনীদের ডেলিকেসিতে পরিণত হয়েছে। ফলে জাতীয় উৎসব; যেমন—পহেলা বৈশাখ ধীরে ধীরে শ্রেণিভেদে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। পান্তা-ইলিশ, যা ছিল সাম্যের প্রতীক, এখন হয়ে উঠছে বৈষম্যের প্রতিচ্ছবি।


গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তন আরো বেদনাদায়ক। নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষ, যারা একসময় নিজেরাই ইলিশ ধরত বা সহজে পেত, তারাই এখন বাজারে গিয়ে ইলিশ কিনতে পারে না। এটি কেবল অর্থনৈতিক বঞ্চনা নয়, এটি সাংস্কৃতিক অধিকার হারানোর মতো এক অনুভূতি। আমাদের নদীর মাছ, কিন্তু আমাদের পাতে নেই—এই আক্ষেপ এখন বাস্তব।


এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত নীতি ও কার্যকর পদক্ষেপ। প্রথমত, সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। জেলে থেকে সরাসরি ভোক্তার কাছে মাছ পৌঁছানোর ব্যবস্থা; যেমন—ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস বা সমবায়ভিত্তিক বিক্রয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমবে এবং দামও নিয়ন্ত্রণে আসবে।


দ্বিতীয়ত, বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে উৎসবের সময় সরকার নির্ধারিত দামে ইলিশ বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যাতে সাধারণ মানুষও এই ঐতিহ্যের অংশ হতে পারে।


তৃতীয়ত, রপ্তানিনীতিতে ভারসাম্য আনতে হবে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পরই রপ্তানির অনুমতি দেওয়া উচিত। এতে দেশের বাজারে সরবরাহ বজায় থাকবে এবং দামও তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকবে।


চতুর্থত, জেলেদের জন্য ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাড়াতে হবে, যাতে তাঁদের উৎপাদন খরচ কমে এবং তাঁরা ন্যায্যমূল্য পান। একই সঙ্গে পরিবহন খরচ কমাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও