হাম ও রুবেলা : লক্ষ্য টিকায় স্বনির্ভর বাংলাদেশ
৫ এপ্রিল ২০২৬ থেকে সরকার দেশব্যাপী শিশুদের মধ্যে হামের টিকার বিশেষ কার্যক্রম শুরু করেছে। বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষাপটে এই টিকাদান কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টিকার গুরুত্ব সম্পর্কে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ সচেতন থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে এই টিকা সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য জেনে রাখা জরুরি।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান যেসব সংক্রামক ব্যাধি অত্যন্ত সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে, হাম তার মধ্যে অন্যতম।হাম বা মিজেলস (Measles) একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। এই ভাইরাসটি রুবিওলা
(Rubeola) বা মিজেলস ভাইরাস নামে পরিচিত। অণুজীববিজ্ঞানে পরিচিত জীবাণুগুলোর মধ্যে এটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে। আক্রান্ত শিশু সংক্রমণের কিছুদিন পরই সুস্থ হয়ে উঠতে পারে, আবার কেউ কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়, এমনকি মৃত্যুবরণও করতে পারে বা দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা এসএসপিই-তে (Subacute sclerosing panencephalitis) ভুগতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৫০ লাখ শিশুর অকালমৃত্যু ঘটে বিভিন্ন কারণে (সংক্রামক রোগসহ)। অথচ ১৯৬০-এর দশকেও শুধু হামে আক্রান্ত হয়েই বছরে প্রায় তিন লাখ শিশুর মৃত্যু হতো। জনস্বাস্থ্যের এই বিশাল অর্জন সম্ভব হয়েছে মিজেলসসহ বিভিন্ন ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা আবিষ্কারের ফলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বীকৃত মিজেলস ভাইরাসের ২৪টি জেনেটিক ধরন থাকলেও এর সেরোলজিক্যাল ধরন একটিই।
ফলে এই অত্যন্ত ছোঁয়াচে মিজেলস ভাইরাসটির বিরুদ্ধে উদ্ভাবিত টিকাটি শুধু হাম প্রতিরোধই করে না, সেই সঙ্গে এটি খুবই স্থিতিশীল বা অপরিবর্তনশীল। ষাটের দশকে যে টিকা আবিষ্কৃত হয়েছিল, তা আজও একই রকম কার্যকর। গত ৬৫ বছরে পৃথিবীর কোথাও মিজেলস ভাইরাস এই টিকার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নজির নেই। অথচ মাত্র কয়েক বছর আগে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসটি নতুন কোনো সংস্করণ
(Variant) কি না তা প্রতিনিয়ত ‘সিকুয়েন্সিং’-এর মাধ্যমে দেখতে হয় এবং সেই অনুযায়ী ভ্যাকসিন হালনাগাদ করতে হয়। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের ভ্যাকসিনও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রায় প্রতিবছর হালনাগাদ করে।
উল্লেখ্য, মিজেলস ভাইরাসটিও ইনফ্লুয়েঞ্জা বা করোনাভাইরাসের মতোই একটি আরএনএ (RNA) ভাইরাস, যা তাদের পলিমারেজ এনজাইমের ‘প্রুফ রিডিং’ বা সংশোধনের ক্ষমতা কম থাকার কারণে দ্রুত বিবর্তিত হওয়ার কথা। সাধারণত ভ্যাকসিন যে অ্যান্টিবডি তৈরি করে, তা ভাইরাসের রিসেপ্টর প্রোটিনের
(Receptor protein) নির্দিষ্ট অংশে যুক্ত হয়ে সংক্রমণ রোধ করে। মিজেলস ভাইরাস যদি বিবর্তিত হয়ে সেই নির্দিষ্ট অংশটি পরিবর্তন করে, তবে ভাইরাসটি তার সংক্রমণের সক্ষমতাই হারিয়ে ফেলে। মূলত এই বৈশিষ্ট্যই ভ্যাকসিনটিকে যুগের পর যুগ কার্যকর রাখতে ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া হামে আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হলে সাধারণত আজীবন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা লাভ করেন। টিকা বা ভ্যাকসিন মূলত সেই প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থাটিকেই কৃত্রিমভাবে আগেভাগে শরীরে তৈরি করে দেয়।
ভ্যাকসিন আবিষ্কারের আগে আমাদের এই বাংলা অঞ্চলেও প্রাচীন কাল থেকে রোগ প্রতিরোধের প্রাকৃতিক পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। ব্রিটিশ চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনারকে (জন্ম ১৭৪৯-মৃত্যু ১৮২৩) ভ্যাকসিনেশনের জনক বলা হলেও ১৭৩১ সালে ব্রিটিশ যাজক ক্লটের লেখা থেকে জানা যায়, বাংলা অঞ্চলে গুটিবসন্ত প্রতিরোধের জন্য চিকিৎসকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের শরীরে হালকা ক্ষত তৈরি করে বসন্তের গুঁড়া দিয়ে দিতেন, যা ‘টিকা’ নামে পরিচিত ছিল। যাজক ক্লটের মতে, তাঁর সময়ের অন্তত ১৫০ বছর আগে থেকেই এই অঞ্চলে এই পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। অর্থাৎ টিকা দেওয়ার এই সংস্কৃতি আমাদের এই জনপদে বহু পুরনো এবং পরীক্ষিত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমান কার্যক্রমে হামের পাশাপাশি রুবেলা ভাইরাসের (Rubella virus) টিকাও দেওয়া হচ্ছে। রুবেলা সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব হলে বর্তমানের হামের মতো অতটা প্রকটভাবে সংবাদমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ায় আসার সম্ভাবনা কম। কারণ এতে আক্রান্ত ব্যক্তির হামের থেকে অপেক্ষাকৃত কম গুরুতর জটিলতা হয়। কিন্তু এর আসল ঝুঁকি অন্য জায়গায়। কোনো নারী যদি গর্ভাবস্থায় রুবেলায় আক্রান্ত হন, তবে গর্ভস্থ শিশুর মৃত্যু হতে পারে কিংবা জন্ম নেওয়া শিশু স্নায়বিকাশজনিত সমস্যা, শ্রবণশক্তির স্বল্পতা বা চোখের জটিলতা নিয়ে জন্মাতে পারে। বিধায়, এই টিকাকে শুধু হামের সুরক্ষা হিসেবে না দেখে রুবেলার ঝুঁকি কমাতেও অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া উচিত—বিশেষ করে কন্যাশিশুদের ক্ষেত্রে।