বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী আসলে কোনটি?
কিছুদিন আগে ৫০তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ফলাফলও প্রকাশিত হয়েছে। ২০০ নম্বরের বহুনির্বাচনী পরীক্ষায় একটি প্রশ্ন ছিল বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী কোনটি? এ প্রশ্নের বহুনির্বাচনী যে নামগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলো পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র। এগুলোর মধ্যে কোনো সঠিক উত্তর আছে কী নেই, তা বিশ্লেষণ করে দেখা যাক।
২০১১ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ‘বাংলাদেশের নদ-নদী’ শীর্ষক ছয় খণ্ডের বই প্রকাশ করেছে। এ বইটি এখন পর্যন্ত তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য। বইটিতে ভুল নেই এমনটি নয়। মাত্র ৪০৫টি নদীর কথা এখানে বলা হয়েছে। এই সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি নদী আমাদের দেশে আছে। এই বইয়ের ‘উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চল’ খণ্ডে পদ্মা নদী সম্পর্কে বলা হয়েছে—‘গঙ্গা ও যমুনা নদী আরিচার কাছে এসে মিলিত হয়েছে। এই মিলিত প্রবাহের নামই পদ্মা, যা চাঁদপুরে আপার মেঘনা নদীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগপর্যন্ত দক্ষিণ–পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়।’ পদ্মার পরিচিতি নম্বর এনসি ৩২, গঙ্গার পরিচিতি নম্বর এনডব্লিউ ২৭। এতে বোঝা যায়, গঙ্গা এবং পদ্মা দুটি আলাদা নদী।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে গঙ্গা নদী। রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দে গঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয় যমুনা নদী। তখন এর নাম হয় পদ্মা। অর্থাৎ গঙ্গা-যমুনার মিলিত নাম পদ্মা। অনেক নদী–বিশেষজ্ঞকেও এটাই বলতে শুনেছি। নদীগবেষক মাহবুব সিদ্দিকীর সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছিল। তিনিও গঙ্গা-যমুনার মিলিত নদীকে পদ্মা নামে অভিহিত করার পক্ষে। প্রচলিত অর্থে রাজশাহীতেও গঙ্গা নদী পদ্মা নামে পরিচিত।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বইয়ের তথ্যমতে, প্রশ্নপত্রে উল্লিখিত চারটি নদীর মধ্যে পদ্মা নদীর দৈর্ঘ্য এখানে দেখানো হয়েছে ১২১ কিলোমিটার, মেঘনা নদীর দৈর্ঘ্য ১৫৬ কিলোমিটার, যমুনা নদীর দৈর্ঘ্য ১৬০ কিলোমিটার এবং ব্রহ্মপুত্রের দৈর্ঘ্য ৮৫ কিলোমিটার। পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই বইয়ে দেখা যায় ইছামতী (কালিন্দী) নদীর দৈর্ঘ্য ৩৩৪ কিলোমিটার, সাংগু নদীর দৈর্ঘ্য ২৯৪ কিলোমিটার এবং ধলেশ্বরী নদীর দৈর্ঘ্য ২৯২ কিলোমিটার। পানি উন্নয়ন বোর্ডের এসব তথ্য ঠিক মেনে নিলে ৫০তম বিসিএস প্রিলিমিনারি প্রশ্নে উল্লিখিত একটি নদীও দীর্ঘতম নদী নয়।
২০২৩ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ‘বাংলাদেশের নদ-নদী; সংজ্ঞা ও সংখ্যা’ শীর্ষক নদীর তালিকার একটি বই প্রকাশ করেছে। বইটি ভুলে ভরা। কী কী বড় ভুল আছে সেসব চিহ্নিত করে আমি বইটি বাতিল করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রথম আলোয় একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। এই বইয়ে ১০০৮টি নদীর তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। বইটিতে দেশের সবচেয়ে দীর্ঘতম নদী হিসেবে পদ্মার কথা বলা হয়েছে। সেখানে দেখানো হয়েছে, পদ্মার দৈর্ঘ্য ৩৪১ কিলোমিটার। গঙ্গা নামের নদীর উল্লেখ নেই এ বইয়ে।
ইছামতী (কালিন্দী) নদীর দৈর্ঘ্য ৩৩৪ কিলোমিটার বলা হয়েছে। এখানে পদ্মা এনসি ৩২ এবং গঙ্গা এনডব্লিউ ২৭ সংখ্যক দুটি নদীকে একসঙ্গে মিলিয়ে পদ্মার দৈর্ঘ্য গণনা করা হয়েছে। গঙ্গা এবং পদ্মা দুটি নদীর দৈর্ঘ্যের যোগফলে যদি পদ্মার দৈর্ঘ্য ঠিক করা হয় তাহলে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা-পদ্মাও অভিন্ন প্রবাহ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তখন এ নদীর দৈর্ঘ্য দাঁড়াবে ব্রহ্মপুত্র ৮৫ কিলোমিটার, যমুনা ১৬০ এবং পদ্মা ১২১ কিলোমিটার এর যোগফল মোট ৩৬৬ কিলোমিটার। অন্যদিকে পুরোনো ব্রহ্মপুত্রের দৈর্ঘ্য ২৮৮ কিলোমিটার এবং ব্রহ্মপুত্রের দৈর্ঘ্য ৮৫ কিলোমিটার। এ দুটি এখনো অভিন্ন প্রবাহ বিদ্যমান। এ দুটির দৈর্ঘ্য যোগ করলে ৩৭৩ কিলোমিটার। তখন এটাকে দীর্ঘতম নদী বলতে হবে।
সর্বশেষ ২০২৫ সালে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় দেশের নদ-নদীর একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এই তালিকা অনুযায়ী বিসিএস পরীক্ষার উল্লিখিত প্রশ্নে সম্ভাব্য উত্তরের চারটি নদীর একটিও দীর্ঘতম নদী নয়। এখানে ইছামতী (কালিন্দী) ৩৩৪ কিলোমিটার, ধলেশ্বরী ৩৩০ কিলোমিটার হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই তথ্য মেনে নিলে দীর্ঘতম নদী ইছামতী (কালিন্দী)।
২০১১ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বইয়ের তথ্য, ২০২৫ সালের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং বাস্তবতা মেলালে উল্লিখিত চারটি নদীর একটিকেও বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী বলা যায় না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বাংলাদেশের নদী
- দীর্ঘতম