রাজহাঁসের সোনার ডিম ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ
জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশ পরিচালনায় কখনো সংবিধানকে মানা হয়েছে, কখনো সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ মাধ্যমে আইন করা হয়েছে।অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর ভিতরেই।দু’টি পক্ষ শুরু থেকেই ছিল। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ক্ষুদ্র কিছু দল জুলাই সনদের অপেক্ষায় ছিল। তাদের ভাবনায় ছিল,ঐকমত্যের ভিত্তিতে তাদের গৃহীত আইনি ব্যবস্থাগুলো সবই সংসদে পাস করিয়ে নেবে।বিএনপি ও কিছু দল সংবিধানকে প্রাধান্য দেওয়ার পক্ষে ছিল।
জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি ৭২ এর সংবিধানের পরিবর্তে নতুন সংবিধান রচনাকেই আন্দোলনের নির্দেশনা হিসেবে মনে করেছে। যাকে তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদ মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা বলে এসেছে। এই বিষয়ে বিএনপি গোড়া থেকেই ভিন্নমত পোষণ করে আসছে। যা শেষ পর্যন্ত ৩১ মার্চ মুলতবি প্রস্তাব পর্যন্ত গড়ায়। তবে মুলতবি প্রস্তাবটি স্পিকার ইচ্ছা করলে বাতিল করে দিলেও পারতেন,যেভাবে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাব আনতে দেননি বিএনপি থেকে নির্বাচিত স্পিকার জমিরুদ্দীন সরকার।সেই বিবেচনায় ৩১ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের স্পিকার উদারতার প্রমাণ দিয়েছেন মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করার মাধ্যমে।
আলোচনার সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও সরকারি দল উদারতা দেখিয়েছে। কারণ স্পিকার ইচ্ছা করলে সরকারি দলের অধিক সংখ্যক আলোচককে এবং বিরোধী দলকে আনুপাতিক হারে সময় দিতে পারতেন। দেখা গেছে সরকারি দল থেকে ৩জন আলোচক থাকলেও বিরোধী দল থেকে সুযোগ পেয়েছেন ৮জন। আবার সময়ের বেলাতেও সরকারি দলের সমান পেয়েছেন বিরোধী দলীয় সদস্যগণ।
বিরোধী দলকে সময় এবং বক্তব্য দেওয়ার যতই সুযোগ দেওয়া হোক না কেন মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনার পর বিষয়টি সুরাহা হয়নি। এবং স্পিকার ভোটেও দেননি। ভোটে দিলে হয়তো ওইদিনই আইনগত ফয়সালা হয়ে যেতো। কিন্তু এর রেশ থেকে যেতো। বিরোধী দল বলার সুযোগ পেতো যে,সরকার সংখ্যাগরিষ্টতার বলে পাস করিয়ে নিয়েছে।ফয়সালার জন্য উভয়পক্ষের রুদ্ধদ্বার কক্ষের আলোচনার দিকে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিষয় হওয়ায় বিস্তারিত আলোচনা-পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলতে হবে।
সালাহউদ্দিন সাহেবের প্রস্তাব ছিল সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে উভয়পক্ষকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হোক। তারা সংসদে প্রস্তাব উত্থাপন করবে এবং সেই অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে বিরোধী দল উভয় পক্ষের সদস্যসংখ্যা সমান সমান চেয়েছে। যা নিয়ে হয়তো আলোচনা হতে পারে। সম্ভাবনা আছে সরকারি দল সেটা নাও মানতে পারে। কারণ সমান সংখ্যক সদস্য হলে আসলে কমিটির মধ্যে ভোটের প্রয়োজন হলে ফয়সালায় পৌঁছানো সম্ভব হবে না।
সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের বিতর্কের মধ্যে কিছু বক্তব্য আগামীদিনেও বিতর্ককে টেনে নিয়ে যাবে। এটা উভয়ের ক্ষেত্রেই ঘটবে।যেমন সরকারি দলের সিনিয়র নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন,‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল’। তিনি সংসদে বলেছেন,‘আমি রাষ্ট্রপতির কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তিনি এমন আদেশ জারি করতে পারেন কি না। রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন,“আমি তো পারি না। আমাকে পারাচ্ছে।” রাজহংসকে জোরপূর্বক স্বর্ণের ডিম পাড়তে বাধ্য করার মতো ঘটনা। এখন সেটা অবৈধ ডিম্ব হয়েছে।’একইসঙ্গে তিনি বলেছেন,‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বিরোধী দলীয় এমপিদের শপথবাক্য সরবরাহ করে সিইসি সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন’।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জুলাই সনদ
- সংবিধান সংস্কার পরিষদ