উপাচার্য নিয়োগে নতুন সার্চ কমিটি: স্বায়ত্তশাসন নাকি প্রশাসনিক প্রভাব?
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে প্রকাশিত একটি পরিপত্র দেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ১ এপ্রিল প্রকাশিত এই পরিপত্রের মাধ্যমে দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাধারণ, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং প্রকৌশল) উপাচার্য নিয়োগের সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে সার্চ কমিটি পুনর্গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কমিটির সভাপতি করা হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্যদ্বয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) একজন সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের একজন অধ্যাপক।
ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এল, যখন দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা নানা সংকট ও আস্থাহীনতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে এই কাঠামো নিয়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নানাবিধ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ একে প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন; আবার অনেকের মতে, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরোপের একটি নতুন সূচনা। এই বিভক্তি মূলত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর সংকটেরই প্রতিফলন।
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র নয়, বরং আমাদের জাতীয় চেতনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ধারকও। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম কিংবা সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলন সবখানেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভূমিকা অগ্রগণ্য। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন কেবল কোনো দাপ্তরিক শব্দ নয়, এটি বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার প্রতীক। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব একাডেমিক নীতিমালা প্রণয়ন, শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও সর্বোপরি নেতৃত্ব নির্বাচনে ওই স্বাধীনতার প্রতিফলন থাকা বাঞ্ছনীয়।
বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোতে আচার্যের (রাষ্ট্রপতি) পরই উপাচার্যের অবস্থান। উপাচার্য কেবল প্রশাসনিক প্রধান নন, বরং একটি প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক সংস্কৃতির রূপকার ও গবেষণার দিকনির্দেশক। তার নেতৃত্বেই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, গবেষণার পরিবেশ তৈরি হয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তার ভিত্তি নির্মিত হয়।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, শিক্ষক সমাজের একটি অংশের দলীয় সংকীর্ণতা ও ব্যক্তিস্বার্থের কারণে অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। যখনই কোনো একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে নেতৃত্ব বা নৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়, তখনই সেখানে বাইরের বা প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়। এই পরিস্থিতি দেশের সার্বিক মঙ্গলের জন্য কোনোভাবেই শুভকর নয়। কারণ একটি জাতির চিন্তার স্বাধীনতা এবং সৃজনশীলতার মূল উৎসই হলো তার বিশ্ববিদ্যালয়।
এই বাস্তবতায় সার্চ কমিটির নেতৃত্বে একজন সচিবকে রাখা হলে স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রশ্ন সামনে চলে আসে। সচিবরা দক্ষ প্রশাসক হতে পারেন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার চেয়ে একাডেমিক দূরদৃষ্টি, গবেষণার গভীরতা ও শিক্ষাদানের দর্শনকে অগ্রাধিকার দেওয়া বেশি প্রয়োজন।
পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে নানা ধরনের সিন্ডিকেটের জন্ম হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত যোগ্যতা ও গুণগত মান উন্নয়নের চেয়ে বিতর্ক ও প্রশ্নেরই জন্ম দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে যে, সার্চ কমিটি প্রকৃত যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের পরিবর্তে পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তকে আনুষ্ঠানিক বৈধতা দেওয়ার মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। ফলে নতুন কমিটি গঠনের ঘোষণায়ও পুরোনো অভিজ্ঞতার ছায়া অনেকের মনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাই এই কমিটিকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রতিটি সিদ্ধান্ত হতে হবে স্বচ্ছ, যুক্তিসঙ্গত ও জনসমক্ষে ব্যাখ্যাযোগ্য।
অনেক শিক্ষাবিদের মতে, সার্চ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানের ওপর অর্পণ করা হলে তা আরও যুক্তিযুক্ত হতো। কারণ ইউজিসি দেশের উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রীয় সংস্থা এবং এর নেতৃত্ব সাধারণত অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদের হাতেই থাকে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাস্তব সংকট, গবেষণার সীমাবদ্ধতা ও একাডেমিক চাহিদা সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত। একইভাবে কোনো অবসরপ্রাপ্ত স্বনামধন্য অধ্যাপক বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষককে এই দায়িত্ব দিলে কমিটি আরও নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হতে পারত।
কমিটির সদস্য হিসেবে দেশের দুটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক, কারণ তারা বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার বাস্তবতা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রাখেন। তবে একইসঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, এই প্রতিনিধিত্ব কি দেশের সমগ্র উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বৈচিত্র্যকে প্রতিফলিত করে? দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষায়িত ও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভিজ্ঞতা এখানে অনুপস্থিত।
উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জটিলতা বিবেচনা করে কমিটিতে বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা, গবেষণা নীতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন এসব ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের যুক্ত করলে কমিটি আরও কার্যকর হতে পারত। কারণ উপাচার্য নির্বাচন শুধু প্রশাসনিক যোগ্যতার বিষয় নয়, এটি একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া যেখানে একাডেমিক ভিশন, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই বিতর্কের মূল কারণ হলো দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক সংকট। দীর্ঘদিন ধরে নীতির অস্থিরতা, মূল্যায়ন পদ্ধতির দুর্বলতা, গবেষণায় অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং শিক্ষক সংকট এই ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলেছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে সনদ বিতরণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস কমেছে, গবেষণার আগ্রহ হ্রাস পেয়েছে এবং বিশ্লেষণী চিন্তার পরিবর্তে মুখস্থ নির্ভরতা বেড়েছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- উপাচার্য নিয়োগ