ইরান-রাশিয়া-চীন অক্ষ: মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির নতুন সমীকরণ
আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বহুমেরুকেন্দ্রিক রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে ইরান, রাশিয়া এবং গণচীনের পারস্পরিক সম্পর্ক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি নতুন কৌশলগত অক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই অক্ষের ভিত্তি কেবল সমসাময়িক ভূ-রাজনীতি নয়—এর শিকড় নিহিত রয়েছে তিন দেশের দীর্ঘ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি এবং পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সমষ্টিগত উপলব্ধিতে। শাহ আমল থেকে ইসলামী বিপ্লব-পরবর্তী সময় পর্যন্ত রাশিয়া-ইরান সম্পর্কের উত্থান-পতন, চীনের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্যিক ও সামরিক যোগাযোগ এবং উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা—এ সবকিছুর সমন্বয় ইরানকে একটি বহুমাত্রিক কৌশলগত নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে স্থাপন করেছে।
রাশিয়া-ইরান সম্পর্কের ঐতিহাসিক পথচলা
রাশিয়া-ইরান সম্পর্কের ইতিহাস মূলত সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সীমান্ত সংঘাত এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে গঠিত। উনিশ শতকে রুশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে ইরানের একাধিক যুদ্ধ (বিশেষত ১৮০৪–১৩ এবং ১৮২৬–২৮) ইরানের ভূখণ্ড সংকুচিত করে এবং রাশিয়ার প্রতি গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। এই ঐতিহাসিক স্মৃতি ইরানের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। তবে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর আমলে সম্পর্ক একটি বাস্তববাদী রূপ নেয়। যদিও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র ছিল, তবুও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং জ্বালানি সহযোগিতা বজায় ছিল। শাহ আমলে ইরান একদিকে সোভিয়েত প্রভাব ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সহযোগিতায় যুক্ত ছিল, অন্যদিকে মস্কোর সঙ্গে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণেও সচেষ্ট ছিল—যা ইরানের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কৌশলগত ভারসাম্যকে স্পষ্ট করে।
১৯৭৯ সালের শিয়া ইসলামী বিপ্লব রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নিয়ে যায়। বিপ্লবের পর ইরান সোভিয়েত ইউনিয়নকে ‘নাস্তিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি’ হিসেবে দেখলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ফলে বাস্তবতার চাপে মস্কোর সঙ্গে সীমিত কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলে। আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর উপস্থিতির বিরুদ্ধে মার্কিন সমর্থিত মুজাহিদিনকে ইরানের সমর্থন দেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন তার মিত্র ইরাককে সমর্থন করলেও মস্কো ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করেনি; বরং কৌশলগত প্রয়োজনের কারণে সীমিত পরিসরে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখে। সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতনের পর রাশিয়া-ইরান সম্পর্ক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করে—উভয় রাষ্ট্রই মার্কিন একতরফা প্রভাবের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়। পুতিন যুগে এসে এই সম্পর্ক আরও কৌশলগত গভীরতা অর্জন করে, বিশেষত সিরিয়া যুদ্ধ এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা চাপ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে।
রাশিয়া-ইরান সম্পর্ক: সামরিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণ
রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য মূলত তিনটি: মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব হ্রাস, সিরিয়া-লেবানন-ইরান অক্ষকে শক্তিশালী করে আঞ্চলিক ভারসাম্য পুনর্গঠন এবং ইউরেশীয় ভূ-রাজনীতিতে বহুমেরুকেন্দ্রিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা। এই লক্ষ্য অর্জনে রাশিয়ার কাছে ইরান এক অপরিহার্য অংশীদার। ফলে রাশিয়া-ইরান সম্পর্ক আজ একটি বিস্তৃত ও গভীর অংশীদারিত্বে পরিণত হয়েছে—যেখানে সামরিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং ভূ-রাজনৈতিক সহযোগিতা পরস্পরকে শক্তিশালী করে একটি বহুমাত্রিক কাঠামো গড়ে তুলেছে।
সামরিক ক্ষেত্রে রাশিয়া ইরানকে এস-৩০০ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট নজরদারি সক্ষমতা, সাইবার প্রযুক্তি এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সহায়তা দিয়েছে। সিরিয়া যুদ্ধ এই সহযোগিতাকে আরও গভীর করে। বাশার আল-আসাদকে সমর্থন দেওয়ার সময় দুই দেশ যৌথ সামরিক অভিযানে অংশ নেয় এবং ইরান প্রথমবারের মতো রাশিয়াকে হামেদান বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়—যা দুই রাষ্ট্রের মধ্যে আস্থার নতুন মাত্রা নির্দেশ করে।
অন্যদিকে ইরানও রাশিয়াকে সামরিক সহায়তা দিয়েছে, বিশেষত ইউক্রেইন যুদ্ধে। ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোন রাশিয়ার সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সস্তা, কার্যকর এবং সহজে উৎপাদনযোগ্য হওয়ায় ইরানের ড্রোন প্রযুক্তি রাশিয়ার জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত মূল্যবান হয়ে ওঠে। পাশাপাশি গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র উপাদান এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে আসে।