স্বাধীনতার ঘোষণা ও তা রক্ষা করার ধারাবাহিকতা
যুদ্ধের সময় এক মা তাঁর দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে অনিশ্চিত অমানিশার মাঝে দিন যাপন শুরু করেন। চট্টগ্রামে বেশ কিছুদিন আত্মগোপনে থেকে বড় বোন খুরশীদ জাহান হকের সঙ্গে যোগাযোগ করে দুই সন্তানকে নিয়ে লঞ্চযোগে ১৬ মে ১৯৭১ নারায়ণগঞ্জে পৌঁছান। তবে তিনি বেশিদিন পালিয়ে থাকতে পারেননি। ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয়ে থাকার পর পাকিস্তানি বাহিনী তাঁর সন্ধান পেয়ে যায়।
২ জুলাই এস কে আব্দুল্লাহর সিদ্ধেশ্বরীর বাসভবন থেকে মা ও তাঁর দুই সন্তানকে তারা গ্রেপ্তার করে। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত তাঁরা সামরিক হেফাজতে বন্দি ছিলেন। তাঁরা কেন বন্দি ছিলেন? কারণ সন্তান দুটির বাবা তাদের কথা চিন্তা না করে সাড়ে সাত কোটি মানুষের কথা ভেবে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে যুদ্ধে চলে যান।
২৬ মার্চ ১৯৭১, মহান স্বাধীনতা দিবস।
আমাদের জাতীয় জীবনে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক দিন। হাজার বছরের সংগ্রামমুখর লড়াইয়ে এ জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। মহান স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, বীরশ্রেষ্ঠ, বীর-উত্তম, বীরপ্রতীকসহ সব জাতীয় নেতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। দীর্ঘ ৯ মাস এক ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর আমরা স্বাধীনতা অর্জন করে বিজয় লাভ করি এবং বিশ্ব মানচিত্রে ফুটে ওঠে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।
‘...তখন রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট, ২৬ মার্চ, ১৯৭১ সাল। রক্তের আখরে বাঙালির হৃদয়ে লেখা একটি ক্ষণ। বাংলাদেশের জনগণ চিরদিন স্মরণ রাখতে ভালোবাসবে। এই ক্ষণটিকে তারা কোনো দিন ভুলবে না, কোনো দিন না।
‘প্রিয় সহযোদ্ধা ভায়েরা,
আমি মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রভিশনাল প্রেসিডেন্ট ও লিবারেশন আর্মি চিফ হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য আবেদন জানাচ্ছি।
বাংলাদেশ স্বাধীন। আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধে নেমেছি। আপনারা যে যা পারেন সামর্থ্য অনুযায়ী অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। আমাদেরকে যুদ্ধ করতে হবে এবং পাকিস্তানি বাহিনীকে দেশছাড়া করতে হবে।’
এ দিনে দেশমাতৃকার শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর ঐতিহাসিক ঘোষণায় দিশাহারা জাতি পেয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার অভয়মন্ত্র।
মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদান অনন্য ও অবিস্মরণীয়। তিনি নিজের নামে জেড ফোর্স গঠন করেন। মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় তিনি উত্তরবঙ্গের রৌমারীতে বাংলাদেশের প্রথম পোস্ট অফিস স্থাপন করেন এবং সেখান থেকেই বাংলাদেশ হিসেবে বিভিন্ন অঞ্চলে চিঠিপত্র সরবরাহ হতে থাকে। প্রবাসী সরকার গঠন হলে তিনি সরকারের রাজস্ব আদায়ের সূচনা করেন। তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধে নিজে একাধিক সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর নৈপুণ্যতার কারণেই মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল আরো দৃঢ় আকার ধারণ করে এবং মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে ত্বরান্বিত করে।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় অর্জনের পর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে কোনোরূপ উচ্চাভিলাষ না করে নির্দ্বিধায় সৈনিক জীবনে ফিরে যান। ১৯৭১ সালে এ দেশের মানুষ জীবন বাজি রেখে দেশ স্বাধীন করেছিল। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই দিনটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অভিশপ্ত দিন হিসেবে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে ১৫ আগস্ট শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ড এবং খন্দকার মোশতাকের ক্ষমতা দখল দেশকে চরম নৈরাজ্যের মধ্যে নিয়ে যায়।
সেই চরম সংকটকালে ’৭৫-এর ৩ নভেম্বর কুচক্রীরা মহান স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানকে সপরিবারে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে। শুরু হয় এক অরাজক পরিস্থিতি। এ অবস্থায় ৭ নভেম্বর স্বজাতির স্বাধীনতা রক্ষায় অকুতোভয় দেশপ্রেমিক সৈনিক এবং জনতার ঢলে রাজপথে এক অনন্য সংহতির স্ফুরণ ঘটে এবং জিয়াউর রহমান বন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত হন। এই অম্লান বিপ্লবে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত হয়। গণতন্ত্র অর্গলমুক্ত হয়ে বিকাশের পথে এগিয়ে যায়, এই দিন থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। মানুষের মনে স্বস্তি ফিরে আসে।
মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল—গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে কাজ করেছেন। তিনি বিভাজনের রাজনীতির পরিবর্তে ঐক্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতিকে দর্শন হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি সব মতাদর্শ এবং পথের মানুষের সঙ্গে আলোচনা, মতবিনিময় ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সামাজিক বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে একটি মানবিক ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য ১৯ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেন। এই কর্মসূচি কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মৌলিক চাহিদার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা উন্নত করার ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অনন্য উদাহরণ।
১৯৮০ সালে একটি কর্মশালায় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘ধর্মকে ভিত্তি করে রাজনীতি করা উচিত নয়। ধর্ম রাজনীতিতে অবদান রাখতে পারে, তবে রাজনীতি কখনোই ধর্মের ভিত্তিতে হতে পারে না।’ তিনি ধর্মীয় আবেগের পরিবর্তে আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি গুরুত্ব দেন, যা দেশের কল্যাণ ও সমৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন। তাঁর এই চিন্তা আজও বিশ্বরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস