জনসংখ্যা নীতির সংস্কার যেভাবে হতে পারে
জনসংখ্যা নীতি হলো কোনো দেশের সরকার কর্তৃক গৃহীত এমন পরিকল্পনা ও কৌশল, যার মাধ্যমে দেশের জনসংখ্যার আকার, বৃদ্ধির হার, বণ্টন ও গুণগত মান নিশ্চিত বা উন্নত করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৭৬ সালে প্রথম ‘বাংলাদেশ জাতীয় জনসংখ্যা নীতি: একটি রূপরেখা’ প্রণীত হয়। ২০০৪ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা নীতি প্রণয়ন করা হয়, যা ২০১২ হালে হালনাগাদ করা হয়।
এরপর ২০২৩ সালে ২০১২ সালের নীতি হালনাগাদ করার তাগিদ আসে। ২০১৫ সালের পরই বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন ও জনসংখ্যা উন্নয়ন সম্মেলনের (আইসিপিডি) লক্ষ্যভিত্তিক প্রতিশ্রুতি অর্জনের প্রেক্ষাপটে ‘বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি ২০১২’ যথার্থতা হারিয়ে ফেলে এবং সুনির্দিষ্ট প্রধান উদ্দেশ্যগুলো অর্জনে বাংলাদেশ সফল না হওয়ায় এবং জাতীয় জনমিতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি হালনাগাদের তাগিদ আসে। এই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে নীতির খসড়া তৈরির কাজ শুরু এবং পরবর্তী সময়ে ‘বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি ২০২৪ (খসড়া)’ প্রণীত হয়।
পরবর্তী সময়ে ‘বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি ২০২৫’ শিরোনামে চূড়ান্ত ঘোষণা আসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস ২০২৫ পালন অনুষ্ঠান (১১ জুলাই ২০২৫) থেকে। এই প্রেক্ষাপটে ‘বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি ২০২৫’–পূর্বের ‘বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি ২০১২’-এর হালনাগাদকৃত নীতি হলেও বেশ কয়েকটি কারণে এ নীতি সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়, যার দ্রুত সংস্কার ও সঠিক বাস্তবায়ন দরকার।
নীতির হালনাগাদকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে এবং পরিসরে (আনুষ্ঠানিক কর্মশালা ও অনানুষ্ঠানিক) একজন জনসংখ্যাবিজ্ঞানের শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে আমার অংশগ্রহণ ও মতামত প্রদান করার সুযোগ হয়েছিল। খসড়া নীতির চূড়ান্তকরণে আমি আমার পেশাগত অবস্থান থেকে মতামত ও পরামর্শ প্রদান করেছি, যা অনুষ্ঠিত সভায় ও কার্যবিবরণীতে সাদরে গৃহীত হয়। কিন্তু চূড়ান্ত নীতিতে বেশ কিছু ক্ষেত্রে প্রতিফলন হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। ফলে হালনাগাদকৃত নীতিতে অসামঞ্জস্যতা, সঠিকতা এবং প্রয়োজনীয় দিকে অধিকতর গুরুত্ব না দেওয়ার ব্যাপারটিও লক্ষ করেছি।
হালনাগাদকৃত নীতি ২০২৫ চূড়ান্ত হওয়ার পর সর্বশেষ জাতীয় উপাত্ত বিশ্লেষণে ও নতুন বাস্তবতায় জনসংখ্যাবিজ্ঞানের একজন শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে প্রশ্ন রাখতেই পারি যে ‘হালনাগাদকৃত বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি ২০২৫’ কি সঠিক পথে রয়েছে? জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে ও মানবপুঁজি তৈরি করতে এ নীতি কি যথার্থ হয়েছে? এ হালনাগাদকৃত নীতি কি আসলেই বাস্তবায়নযোগ্য?
নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার নির্বাচনী ইশতেহার-২০২৬-এ ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ ও আসন্ন ‘লংজিভিটি ডিভিডেন্ড’–এর সুবিধা অর্জনে জনমিতির পরিবর্তনকে অগ্রাধিকার [বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নির্বাচনী ইশতেহার, পৃষ্ঠা-১৭] বাস্তবায়নে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও যৌক্তিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর আলোকে বর্তমান জনসংখ্যা নীতি সংস্কার হওয়া প্রয়োজন বলেই মনে করি।
সঠিক জনমিতিক পরিস্থিতি, সামাজিক চাহিদা এবং উন্নয়ন অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হওয়ায় সে ক্ষেত্রে বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের উচিত হবে দেশের জনসংখ্যা ও সংস্কারকৃত জনসংখ্যা নীতিকে উন্নয়নের কেন্দ্র রেখে কাজ করা। আমার এই লেখায় যে ১৩টি মতামত ও পর্যবেক্ষণ ব্যক্ত করছি, বর্তমান সরকার ও বিভিন্ন অংশীজন চাইলে তার আলোকে ‘বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি ২০২৫’-এর যৌক্তিক সংস্কার সাধন করতে পারেন।
১. বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ। আমাদের সব উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে জনসংখ্যা ও জনসংখ্যার কাঠামো ও বণ্টনগত দিকে লক্ষ রেখে সব ধরনের পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়ন করা উচিত। সেই বিচারে জনসংখ্যার গুণগত ও পরিমাণগত উভয় দিকই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। ২০২৫–এর নীতিতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ (জন্মহার কমানো–প্রতিস্থাপনযোগ্য প্রজনন হারে পৌঁছানো) থেকে জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা ও অধিকার দৃষ্টিভঙ্গিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
এ নীতি প্রণয়নের পর সর্বশেষ জাতীয় জরিপে (২০২৫) দেখা গেছে, দেশে মোট প্রজনন হার (টিএফআর) বেড়ে গেছে। বর্তমান হালনাগাদকৃত নীতির উদ্দেশ্য নির্ধারণে পরিমাণগত দিককে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, যা ২০১২ সালের নীতিতে ছিল। ফলে হালনাগাদ করা জনসংখ্যা নীতি ২০২৫-এর উদ্দেশ্য সংস্কার বা পরিমার্জন করে সময়কাল উল্লেখপূর্বক প্রতিস্থাপনযোগ্য প্রজনন হারে দ্রুত পৌঁছানো এবং তা ধরে রাখা বাঞ্ছনীয়।
পরিবার পরিকল্পনা খাতে ব্যাপক সংস্কার অত্যাবশ্যক। পরিবার পরিকল্পনা খাতে মানবসম্পদ (জনবল) পদের বিপরীতে সংখ্যা ও সরবরাহ শৃঙ্খলে ঘাটতি লক্ষণীয়। অথচ পরিবার পরিকল্পনায় গতি ধরে রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিশেষ করে বয়স নির্দিষ্ট প্রজনন হার—উচ্চ কিশোরী মাতৃত্ব ও উচ্চ বাল্যবিবাহের হার বিষয়ে টার্গেটভিত্তিক লক্ষ্য ও কৌশল থাকা উচিত ছিল, যেমনটি আছে আইসিপিডি+২৫ (জনসংখ্যা ও উন্নয়নবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ২৫ বছর পূর্তি)-এর প্রতিশ্রুতিতে। এ ক্ষেত্রে নীতিতে লক্ষ্যকেন্দ্রিকতা (টার্গেট) থেকে সরে যাওয়াটা যথাযথ হয়নি বলেই মনে করি।