আমাদের সময়ের ঈদ আর এখনকার ঈদ
ঈদে আগে এত বৈষম্য দেখা যেত না। কারণ তখন আমরা এত উন্নত ছিলাম না। এখন উন্নত হয়েছি, এ জন্য বৈষম্য বেড়েছে। আগে ঈদের মধ্যে সামাজিকতা এখনকার চেয়ে বেশি দেখা যেত। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে অতটা বৈষম্য ছিল না। পারস্পরিক দেখাশোনা করার তাগিদ ছিল।
আগে আরেকটা ব্যাপার দেখা যেত। আমরা তো পুরান ঢাকায় থাকতাম। দেখতাম ঈদের দিন ছেলে-মেয়েরা সিনেমা দেখতে যেত। ঈদ উপলক্ষে নতুন সিনেমা দেখার একটা চল ছিল। সেটা দেখার জন্য কিশোর-কিশোরীরা অপেক্ষা করত। এখন তো আর সিনেমা হলই নেই। সিনেমার ওই বিনোদনটাও চলে গেছে।
আমাদের সময়ে দেখেছি, ঈদের আনন্দ মোটামুটি ছিল খাবারদাবারে। এখন তো নতুন নতুন খাবার বা পুরোনো খাবারই নতুনভাবে পাওয়া যায়। আগে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া বা সামাজিকতার একটা ব্যাপার ছিল। ঈদের দিন বাসায় সব ধরনের খাবার রান্না করা হতো। এখন খাওয়াদাওয়াটা আগের মতো ঘরে ঘরে হয়। কিন্তু পরিবর্তন একটা হয়েছে। বিশেষ করে শহরের লোকজন নিজেরা রান্না করার চাইতে রেস্টুরেন্ট থেকে কেনাই বেশি পছন্দ করে। দ্বিতীয়ত, সামাজিকতা কমে গেছে। আগে যেমন মানুষ ঈদ উপলক্ষে মানুষের বাড়িতে যেত বা অপেক্ষা করত যে মানুষ বাড়িতে আসবে। সেটা এখন কমে গেছে। পারিবারিক বা খুবই ঘনিষ্ঠজন ছাড়া এখন আর সামাজিকতা দেখি না।
এখন তো রেস্টুরেন্টের সংস্কৃতি চলে এসেছে। ঘরে রান্নার চেয়ে রেস্টুরেন্টে যাওয়াই সবার পছন্দ। আরও যারা ধনী তারা বিদেশে যাচ্ছে। এটা গেল একটা দিক। আরেকটা দিক হলো, পরিবারের মধ্যেও যারা বিত্তবান আর যারা বিত্তহীন—তাদের মধ্যে আত্মীয়তাটা নেই। যারা ধনী হতে পেরেছে তাদের নতুন আত্মীয়স্বজন হয়েছে। আপন যে ভাই-বোন তাদের সঙ্গেও আগের সম্পর্কটা নেই। আবার যারা সুযোগ বঞ্চিত ভাই-বোন, তারাও পরস্পর থেকে আলাদা হয়ে গেছে। অসম ধনবণ্টন পারিবারিক সম্পর্কটাকেও নষ্ট করছে।
ঈদ আসলে সবার জন্য সমান খুশির বার্তা নিয়ে আসে না। শুধু নামাজের সময় ধনী, দরিদ্র সবাই একসঙ্গে নামাজ আদায় করে। কিন্তু নামাজের সময়ও দেখা যাবে মসজিদের বাইরে বহু মানুষ অপেক্ষা করে কিছু পাবে বলে বা ভিক্ষার জন্য। আমরা এখন আর সাম্যটা দেখি না। এটা আগেও ছিল। তবে এখন বৈষম্য অনেক বেড়েছে। এই বৈষম্য হলো উন্নতির কারণে। আমাদের দেশে যে উন্নতিটা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে পাকিস্তান আমল থেকে এখনো, সেটা হচ্ছে পুঁজিবাদী কাঠামোয়। এটা অল্প মানুষের উন্নতি হবে, মুনাফা পাবে। আর বেশির ভাগ মানুষ যারা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত তারা বঞ্চিত হবে। ওই বৈষম্যটাই সর্বত্র দেখা যায়। ঈদের সময়ও তা ভালোভাবে দেখা যায়। আমি তো শুধু ভিক্ষার কথা বললাম। জামা-কাপড়ের ব্যাপারেও দেখা যাবে, চলাফেরার ক্ষেত্রেও দেখা যাবে, ঈদের সময় আরও প্রকট হয়ে দেখা দেয়।
কেউ লাখ টাকার কাপড় কিনছে, কেউ কিনতেই পারছে না! আমরা চেয়েছিলাম মানুষে মানুষে অধিকার ও সুযোগের সাম্য। সেটা হয়নি। এখানে ক্রমাগত বৈষম্য বাড়ছে। উন্নতি যত বাড়ছে, বৈষম্যও তত বাড়ছে।