সাহিত্যে স্বৈরতন্ত্র ও প্রতিরোধ : স্মৃতি বনাম বিস্মৃতি

ডেইলি স্টার খোরশেদ আলম প্রকাশিত: ১১ মার্চ ২০২৬, ১৬:২৮

স্বৈরতন্ত্র চিরকাল থাকে না, কিন্তু সাহিত্য টিকে যায়। সাহিত্যের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরোধের প্রসঙ্গও আসে। বলা ভালো, সমাজ-সাংস্কৃতিক ক্রিয়াশীলতা থেকে জন্ম নেয় প্রতিবাদী সাহিত্য।


মিলান কুন্দেরা তার ‘দ্য বুক অব লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং’ (১৯৭৯) গ্রন্থে বলেন, “শক্তির বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই হলো বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির লড়াই”। রাজনৈতিক স্মৃতি-বিস্মৃতি এবং ইতিহাসের ওপর ক্ষমতার আধিপত্য বিষয়ে তার ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। তিনি দেখান যে, স্বৈরাচারী শাসনের অস্ত্র কেবল রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন নয়, ইতিহাস ও গণস্মৃতিকে মুছে ফেলা। এই ‘বিস্মৃতি’র রাজনীতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে সাহিত্যিকরা ‘বিকল্প আর্কাইভ’ বা স্মৃতির দুর্গ তৈরি করেন।


কাজী নজরুল ইসলাম, আবুল মনসুর আহমদ, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, হাবিব জালিব (পাকিস্তানি বিপ্লবী কবি), সুকান্ত ভট্টাচার্য, আল মাহমুদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, ফাহমিদা রিয়াজ, অবতার সিং সান্ধু (পশ), শহীদুল জহির, অমিতাভ ঘোষ, অরুন্ধতী রায়— তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ সাহিত্যে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে ও প্রতিরোধের পক্ষে অগ্নিঝরা বক্তব্য রেখেছেন। তাদের লেখায় মানবিক সংহতি ও লেখকের স্মৃতি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপের চেয়ে শক্তিশালী। কারণ যতক্ষণ একজন লেখক সত্য উচ্চারণ করছেন, ততক্ষণ স্বৈরতন্ত্রের জয় অসম্পূর্ণ।


সাহিত্য কেবল সময়ের দর্পণ নয়, ভবিষ্যতের এক শাশ্বত রূপরেখাও। এই দায়বদ্ধতা থেকেই সাহিত্যিককে দাঁড়াতে হয় রূঢ় সত্যের মুখোমুখি। এ প্রসঙ্গে আন্তোনিও গ্রামশির সেই কালজয়ী দর্শন—‘বুদ্ধিবৃত্তিক নিরাশাবাদ’ ও ‘ইচ্ছাশক্তির আশাবাদ’—প্রতিকূল সময়ে পাঞ্জেরির মতো পথ দেখায়। 


বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানে একজন লেখক আমূল বাস্তববাদী; তার নির্মোহ বিশ্লেষণে শাসকের দোর্দণ্ড প্রতাপ, বর্তমানের ভয়াবহতা কিংবা পরিবর্তনের কণ্টকিত পথ বিন্দুমাত্র আড়াল হয় না। বুদ্ধির নিরিখে পরিস্থিতির অন্ধকারটাই হয়তো আগে চোখে পড়ে, যাকে আমরা বলতে পারি এক ধরনের যৌক্তিক নিরাশাবাদ। কিন্তু এই অন্ধকারের বিপরীতে লেখককে হতে হয় অদম্য ইচ্ছাশক্তির অধিকারী।


পরিস্থিতির ভয়াবহতা জেনেও তা পরিবর্তনের জন্য নৈতিক জেদ জরুরি। এটাই হয়তো লেখক জীবনের প্রকৃত সক্রিয়তা। যখন চারপাশ নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে নিমজ্জিত, তখন তাদেরকে গহিন অরণ্য পাড়ি দেওয়ার সাহস রাখতে হয়। এক নতুন ভোরের স্বপ্ন জিইয়ে রাখতে হয় লেখককে। 


স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াকু সাহিত্যিকরা সমাজ ও রাজনীতির পচনকে বুদ্ধি দিয়ে ব্যবচ্ছেদ করেন, অথচ কলমের খোঁচায় মানুষের মনে জাগিয়ে রাখেন পরিবর্তনের দুর্মর আকাঙ্ক্ষা। নিরাশার পারাবারে দাঁড়িয়ে আশার আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে রাখাই হলো ‘পথ-দেখানিয়া’ সাহিত্যিক আশাবাদ।


উপমহাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা কত শত উত্থান-পতনের ঘটনা দেখি। কেবল রাজবংশের উত্থান-পতন নয়, শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের অবিরাম লড়াইয়ের ইতিহাস আমাদের সামনে আসে। যখনই রাষ্ট্রের শাসনযন্ত্র স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছে, তখনই কবি-সাহিত্যিকরা তাদের কলমকে প্রতিরোধের দুর্গে পরিণত করেছেন। স্বৈরতন্ত্র বারবার তাদেরকে বন্দুকের নলের মুখোমুখি করেছে, ‘বিস্মৃতি’র মধ্য দিয়ে ক্ষমতার নতুন বয়ান তৈরির চেষ্টা করেছে। কারণ ইতিহাসকে বেমালুম মুছে দিতে পারলে স্বৈরশাসকের ব্যাপক লাভ। তারা মানুষের দগদগে স্মৃতিকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিতে চায়। এমনকি দিনকে দিন ঘটে যাওয়া অপরাধকেও স্বাভাবিক করে তোলার অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যায়। ঠিক এই জায়গাতেই শুরু হয় সাহিত্যিকের লড়াই।


স্বৈরতন্ত্র মানুষের শরীরকে বন্দি করতে পারে, কিন্তু মনস্তত্ত্বের গভীরে থাকা স্বপ্ন আর স্মৃতির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে না। এই স্বপ্ন ও স্মৃতিকে পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব নেয় সাহিত্য। পাঞ্জাবি কবি পশের সেই কালজয়ী সতর্কবার্তা : “সবচেয়ে বিপজ্জনক পুলিশের মার নয়, সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশদ্রোহিতার অপরাধে জেল খাটাও নয়... সবচেয়ে বিপজ্জনক আমাদের স্বপ্নের মৃত্যু হওয়া।” 


প্রতিরোধের ভাষা সবসময় এক হয় না। সরাসরি বা উচ্চকণ্ঠ বিদ্রোহের ক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলাম এবং হাবিব জালিবের নাম অবিস্মরণীয়। ১৯২৩ সালে নজরুলের ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ ছিল স্বৈরাচারী ব্রিটিশ আইনের বিরুদ্ধে স্মৃতির এক মহাবয়ান। রাজদ্রোহের অপরাধে বিচারক আর এন লজের আদালতে এই ‘জবানবন্দী’ পাঠ করা হয়। 


নজরুলের এই আপসহীন সুর কয়েক দশক পর প্রতিধ্বনিত হয় কবি হাবিব জালিবের কণ্ঠে। সামরিক শাসক আইয়ুব খান একটি সাজানো সংবিধান চাপিয়ে দিলে জালিব জনসভায় দাঁড়িয়ে রাজপথের ভাষায় গর্জে উঠেছিলেন: “দীপ জিসকা মহলাত হি মে জ্যলে/ চাঁদনি জিসকি মুফলিস কে ঘর না ঢলে/ অ্যায়সা দস্তুর কো, সুবহে-বে-নূর কো/ মে নহি মানতা, মে নহি জানতা।” অর্থাৎ, “যে প্রদীপ কেবল বিলাসী প্রাসাদেই জ্বলে/ যে জ্যোৎস্না গরিবের কুটিরে কখনো ঝরে না,/ এমন সংবিধানকে, এমন আলোহীন সকালকে,/ আমি মানি না, আমি জানি না।”


যে-ব্যবস্থায় চাঁদের আলো গরিবের ঘরে পৌঁছে না, সেই শাসনব্যবস্থা আসলে একটি 'আলোহীন সকাল'। স্বৈরতন্ত্র উন্নয়নের নামে মিথ্যা আশার আলো দেখালেও সাহিত্যিক তার প্রখর দৃষ্টি দিয়ে অন্ধকারের স্বরূপটি ঠিকই চিনে নেন। তারা সমস্বরে 'না' বলার স্পর্ধা দেখান। জালিবের পক্ষেও এই ‘না’ বলাটাই হলো সাহিত্যের প্রথম কাজ। 


স্বৈরতন্ত্র চায় আনুগত্যের রশি ধরে থাকবে সবাই, কিন্তু সাহিত্য বলে প্রশ্ন করো, করতে হবে। জালিব তাই প্রমাণ করেন, রাজপথের কবিতা ড্রয়িংরুমের কবিতার চেয়ে শক্তিশালী। আপসহীন কবিতার জন্য জালিব হয়ে উঠেছেন ‘শায়ের-ই-আওয়াম’ বা ‘জনগণের কবি’। আইয়ুব খান থেকে শুরু করে জিয়া-উল-হকের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তার কলম ছিল সবসময় সোচ্চার।


পাঞ্জাবি কবি পশ আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, অন্যায় সহ্য করে যাওয়া বা নির্বিকার থাকাটাই স্বৈরতন্ত্রের সবচেয়ে বড় জয়। পশের কবিতায় স্বৈরতন্ত্র মানে 'মৃতবৎ ব্যবস্থা'। তার মতে, সবচেয়ে বিপজ্জনক সেই ঘড়ি, যা আপনার কবজিতে চললেও আপনার সময়ের জন্য স্থির হয়ে থাকে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক সচেতনতা হারানো মানে মানসিকভাবে দাসে পরিণত হওয়া।


জার্মান সাহিত্যিক বের্টোল্ট ব্রেখট বলেছিলেন: “ইন দ্য ডার্ক টাইমস / উইল দেয়ার অলসো বি সিংগিং? / ইয়েস, দেয়ার উইল অলসো বি সিংগিং। / অ্যাবাউট দ্য ডার্ক টাইমস।” অর্থাৎ, “অন্ধকার সময়েও কি গান গাওয়া হবে? / হ্যাঁ, গান গাওয়া হবে— / অন্ধকার সময়েরই গান।”

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও