বাংলাদেশ ব্যাংক ও রাজনৈতিক প্রভাবের পুনরুত্থান
নির্বাচন পরবর্তী সময়ে নতুন সরকার ও তার নেতৃস্থানীয় লোকজনের বিভিন্ন উন্নয়নমুখী কথাবার্তা ও নীতিবাক্যে আশান্বিত হয়ে গত কিছুদিন আমাদের আর্থিক বাজার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা চিন্তা করছিলাম।
এরই সূত্র ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তার কথা লিখব বলে প্রায় মনস্থির করে ফেলেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগের খবর পত্রিকা মারফত জানতে পেরে মনজাগতিক টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে গেলাম। একই দিন দিবাগত রাতে ঈষৎ ভূমিকম্পের খবরে ভাবলাম আমার মতো প্রকৃতিও হয়তো কিছুটা মানুষিক দোদুল্যমানতায় ভুগছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সদ্য বিদায়ী গভর্নর দেশের ক্রান্তিকালীন সময়ে ব্যাংকটির হাল ধরেছিলেন এবং কিছু সমালোচনা থাকলেও মোটের উপর ভালোই কাজ করছিলেন। কয়েকটি রুগ্ণ ব্যাংকের একীভূতকরণের অযৌক্তিক কাজ ছাড়া সামষ্টিক অর্থনীতি তিনি বেশ ভালোই সামাল দিয়েছেন।
কিন্তু হঠাৎ করে নির্ধারিত সময়ের আগেই তাকে বিদায় করে দিয়ে নতুন গভর্নর নিয়োগের মাধ্যমে দেশের আর্থিক বাজারে ভুল বার্তা প্রদান করা হয়েছে। রাজনৈতিক পালাবদলে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা দেশের উন্নয়ন কাঠামোর জন্য অত্যন্ত জরুরি আর তাই এই পরিবর্তন আর্থিক খাতে পুনরাজনৈতিকরণের একটি প্রগাঢ় সংকেত হিসেবেই পরিগণিত হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের পদটি নেহাত অলংকৃত পদ নয় বরং বাজার ব্যবস্থায় গভর্নরের পদটি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষায় যে সকল প্রয়োজনীয় মুদ্রানীতি প্রণয়নের প্রয়োজন তার উপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের বিশেষ প্রভাব পৃথিবীব্যাপী প্রায় সকল কেন্দ্রীয় ব্যাংকেই পরিলক্ষিত হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের প্রভাব এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে অনেকেই মনে করেন ১৯২৮ সালে নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর বেনিয়ামিন স্ট্রং এর মৃত্যু না হলে তার দূরদর্শী নীতির মাধ্যমে তিনি হয়তো ১৯৩০ এর দশকের মহামন্দা রোধ করতে পারতেন।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের খবরে আর্থিক বাজার ও মূলধন বাজার যুগপৎ ভাবে প্রভাবিত হয়। বাজার নিয়োগপ্রাপ্ত গভর্নরের বিভিন্ন গুণাবলি, যেমন শিক্ষাগত যোগ্যতা, অর্থনীতির জ্ঞান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব ও কাজের ব্যাপারে ব্যাপক অভিজ্ঞতা, কগনিটিভ সক্ষমতা, সামাজিক মূলধন ইত্যাদি, বিবেচনা করে এবং সেই অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভবিষ্যৎ কর্ম পরিকল্পনা ও সক্ষমতা যাচাই করে।
এই সকল বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি বৈশ্বিক মানদণ্ডে পিছিয়ে থাকে তবে বাজার ওই নিয়োগের মাঝে রাজনৈতিক প্রভাবের বার্তা পায় যা পরবর্তীতে আর্থিক বাজারের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে। নতুন গভর্নরের ব্যক্তিগত যোগ্যতা সম্পর্কে আলোচনা পরিহার বাঞ্ছনীয়।
কিন্তু তার রাজনৈতিক পরিচয় ও আর্থিক বিষয়ের কিছু অনিয়মের যে খবর বাজারে প্রচলিত তা অবশ্যই প্রাসঙ্গিক কারণ রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ও আর্থিক অনিয়ম আর্থিক বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। উপরন্তু তার ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত অসম্ভব কিছু নয় । এতত্সত্ত্বেও তার নিয়োগ যে বাজারমুখী সিদ্ধান্ত নয় বরং প্রকারান্তরে তা যে রাজনৈতিক তা অনুধাবন কোনো কষ্টসাধ্য বিষয় নয়।
রাজনৈতিক সরকার ও স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যেকার অত্যাবশ্যকীয় দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সুদের হার। রাজনৈতিক সরকার তার স্বল্পমেয়াদি জনপ্রিয়তার জন্য নিম্ন সুদের হার বহাল রাখতে সর্বদা সচেষ্ট থাকে। রাজনৈতিক সরকারের ধারণা নিম্ন সুদের হারের মাধ্যমে অতি দ্রুত বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায় যা প্রকারান্তরে তাদের নির্বাচনী প্রচারণার মান রাখতে সহায়তা করতে পারে।